এটি আশা করা বোকামি হবে যে এর মাধ্যমে কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন এসে যাবে। তবে একে কেবল একটি সাময়িক উত্তেজনাকর মুহূর্ত বলে উড়িয়ে দেওয়াটাও বোকামি হবে।
বহু বছর পর ভারতীয় হিসেবে নিজেকে বেশ সৌভাগ্যবান ও আনন্দিত মনে হচ্ছে। ঠিক যখন মনে হচ্ছিল সমস্ত আশা ফুরিয়ে গেছে, ঠিক তখনই তারা এসে হাজির হলো। বৃষ্টির মধ্য দিয়ে হাজির হলো একদল তরুণ তেলাপোকা বা শোলাপোকা, বিচারক আর উপহাসের সেই অদ্ভুত মিলনের ঔরসজাত সন্তান।
ঘটনাটি আমরা সবাই এরমধ্যে জেনে ফেলেছি, তবুও রেকর্ডের জন্য আবার বলছি। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণ ভারতীয়দের ব্যঙ্গ করে ‘শোলাপোকা’ বলে একটি অত্যন্ত দাম্ভিক ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন। এর জবাবে বস্টনে বসবাসরত এক ছাত্র অভিজিৎ দ্বীপকে ইনস্টাগ্রামে একটি কমেন্ট করেন: “সব শোলাপোকা যদি একসঙ্গে জোট বাঁধে, তবে কী হবে?” লাখ লাখ মানুষ এতে সাড়া দিল। আর এভাবেই জন্ম নিল ‘শোলাপোকা জনতা পার্টি’ (ককরেচ জনতা পার্টি)। দ্বীপকে বনে গেলেন শোলাপোকাদের পাইপ বাজিয়ে ইঁদুর তাড়ানোর সেই কিংবদন্তি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা (যিনি সবাইকে নিজের পিছু পিছু টানেন)।
দলটির প্রথম দাবি ছিল শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। এই মন্ত্রী মহাশয় এমন এক দুর্নীতিগ্রস্ত ও পচে যাওয়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বসে আছেন, যার অধীনে নিয়মিত পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধী দলগুলোর মতে, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫২ বার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এসব প্রশ্ন ফাঁসের কারণে লাখ লাখ তরুণের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে, যারা পরীক্ষার জন্য বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল। এদের অনেকের বাবা-মা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে এবং পরীক্ষায় বসার ফি দিতে নিজেদের জমি বা ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। এটি একধরনের আইনি চাঁদাবাজির অভিনব রূপ। সম্প্রতি ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট (এনইইটি) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর মানসিক অবসাদে ভুগে ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
অনলাইনে শোলাপোকাদের এই ক্ষোভ যখন সুনামির রূপ নেয়, তখন গত ৬ জুন বস্টন থেকে ফিরে সরাসরি দিল্লির বিখ্যাত আন্দোলনস্থল যন্তর মন্তরে চলে যান দ্বীপকে। লাদাখের সুপরিচিত আন্দোলনকারী ও শিক্ষাসংস্কারক সোনম ওয়াংচুক তার সঙ্গে যোগ দেন এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) ছয় জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, নেহা বোরা, মনীশ কুমার, আমীন অমিতেশ, দানিশ আলী, হৃষিকেশ এবং দীপক ঘোষণা দেন যে তারাও অনশনে যোগ দেবেন এবং পাশের একটি মঞ্চে অবস্থান নেন। অন্যান্য শহরেও শুরু হয় প্রতিবাদ। অনশনরতদের শারীরিক অবস্থা যখন আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে, তখন ইন্টারনেটে আলোড়ন তোলা সেই তরুণ শোলাপোকারা সত্যি সত্যিই যন্তর মন্তরে এসে হাজির হতে শুরু করে। ‘শোলাপোকা জনতা পার্টি’ ঘোষণা দেয় যে, ২০ জুলাই যেদিন সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা, তারা সংসদ ভবন অভিমুখে লং মার্চ করবে।
পূর্বঘোষিত এই মার্চের ঠিক দুই দিন আগে পুলিশ মঞ্চ থেকে সোনম ওয়াংচুককে জোর করে তুলে নিয়ে আটক করে। প্রথমে তাকে একটি সরকারি হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে তার স্ত্রীর জোরালো অনুরোধে একটি বেসরকারি হাসপাতালে রাখা হয়। তিনি তখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। আর মার্চের দিন অর্থাৎ ২০ জুলাইয়ের সকালে আইসার শিক্ষার্থীরা তাদের অনশন ভাঙেন।

তরুণ-যুবারা ঝাকে ঝাকে এসে আন্দোলনে শামিল হচ্ছে।
পরে শোলাপোকারা ঝড়ের গতিতে রাজধানী দখল করে নিল। তারা ট্রেন, বাস, বিমান ও মেট্রোয় চড়ে আসতে শুরু করল, আর প্রতি ঘণ্টায় তাদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। দিল্লির বর্ষার আকাশ মেঘে ছেয়ে ফেলার আগেই তারা হাজার হাজার সংখ্যায় যন্তর মন্তরে জড়ো হতে শুরু করল। সূর্য ওঠার আগেই পরিষ্কার হয়ে গেল যে, হতাশা আর ক্ষোভে অন্ধ এক তরুণ প্রজন্ম, যাদের ভবিষ্যৎ তাদের চোখের সামনেই তছনছ করে দেওয়া হয়েছে, তারা আজ তাদের বাবা-দ্রেদাদা এবং অভিভাবকদের ছেড়ে দেওয়া অধিকারগুলো ছিনিয়ে নিতে এসেছে। ফিরে পেতে চাইছে একটি দেশ ও জাতি হিসেবে আমাদের আত্মমর্যাদা, গণতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের মৌলিক অধিকার। আন্দোলনকারীরা তাদের চরম সাহস, মার্জিত আচরণ ও হাস্যরসের মাধ্যমে সেই পঙ্গু করা ভয়কে ঝেড়ে ফেলে দিল, যা এতদিন আমাদের সবার মজ্জাগত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দিন শেষে এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এই আন্দোলন কেবল প্রতিবাদকারী বা তাদের নেতাদের নির্দিষ্ট কিছু দাবির মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। ধর্মেন্দ্র প্রধান তো এখন অতি তুচ্ছ এক ব্যাপার। এর চেয়েও অনেক বড় কিছু এখন দাবি হিসেবে জড়িয়ে গেছে। শীর্ষ থেকে শুরু করে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে পচন ধরেছে, তা আজ পচা লাশের মতো স্পষ্ট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এমনকি দলটির সবচেয়ে কনিষ্ঠ শোলাপোকাটি, যাদের বয়স হয়তো সাত-আট বছরের বেশি নয়, সেও এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে আজ।
মার্চের ঠিক কয়েক দিন আগে অত্যন্ত দ্রুত ও গোপনে একজন নতুন পুলিশ প্রধান নিয়োগ করা হয়। এদিকে আমাদের অথর্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভয়ংকর দক্ষতা নিয়ে বিস্তর ফিসফাস আছে। সেই পুলিশ বাহিনী বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেউই ২০ জুলাইয়ের শোলাপোকার সুনামির বিশালতা অনুমান করতে পারেনি। তারা নানা ফাকফোকর খুঁজে সবকিছুই চেষ্টা করে দেখেছে। তারা বাস, রাস্তা ও মেট্রো স্টেশনগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। কোনো লাভ হয়নি। তারা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইন্টারনেটের এই আদিবাসী সন্তান তথা তরুণ শোলাপোকারা এমন সব মিম ও ভিডিওর প্লাবন বইয়ে দিল, যা একই সঙ্গে মানুষকে হাসায় এবং কাঁদায়। বিশ্বের অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে দিল্লিতে আন্দোলনকারী তরুণীরা বলেছেন যে, এই ভিড়ের মধ্যে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ বোধ করেছেন, যদিও কেউ কেউ পুলিশের বিরুদ্ধে গায়ে হাত দেওয়ার বা শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছেন। আমরা দেখলাম মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, প্রতিটি জাতি ও শ্রেণির মানুষ একসঙ্গে আসছে, পুলিশি বাধার মুখে একে অপরকে সাহায্য করছে এবং রক্ষা করছে। তারা আমাদের কোনো লম্বা বক্তৃতা দেননি, বড় বড় বুলি আওড়াননি; বরং তারা আমাদের সামনে জীবন্ত করে তুলে ধরেছেন আমাদের স্বপ্নের সেই সুন্দর ভারতকে, যে ভারতের সম্ভাবনা আজও বেঁচে আছে।
এই বিপদ মোকাবিলা করতে পুলিশ তাদের হলুদ রঙের ধাতব ব্যারিকেডগুলো জোড়াতালি দিয়ে এক করল এবং তাদের পরীক্ষিত ও পুরনো অস্ত্রগুলো বের করে আনল: পাথরভর্তি ট্রাক এবং আগে থেকেই ভাঙচুর করা কিছু গাড়ি, যেন তারা দেখাতে পারে যে তরুণেরোই সহিংসতা শুরু করেছিল এবং পুলিশ কেবল আত্মরক্ষা করেছে। তারা লাঠিসোঁটা ও রড নিয়ে প্রস্তুত থাকা সাদাপোশাকের একদল গুন্ডা বাহিনীকে মাঠে নামাল। নিজেদের প্রস্তুত করতে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স তাদের ইউনিফর্ম থেকে নামফলক বা নেমট্যাগ পর্যন্ত খুলে ফেলেছিল। অনুগত মূলধারার গোদি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো মিথ্যা খবর প্রচারের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিল (তাদের কেউ কেউ তো একটু বেশি উৎসাহী হয়ে এমন সব ঘটনার খবর প্রচার শুরু করল, যা তখনো ঘটেইনি। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো বর্তমান নিয়ে নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পকাহিনী উন্নয়ন সংবাদ পরিবেশন করতেই বেশি পছন্দ করে)।
কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হলো না। পুলিশ ও র্যাবের সদস্যরা উন্মত্তের মতো লাঠি চালাল, শিশুদের মাথা ফাটিয়ে দিল এবং হাড়গোড় ভেঙে দিল। তারা টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করল। কিন্তু তরুণরা থমকে দাঁড়াল না, তারা সামনে এগিয়ে যেতে থাকল। সোজা সংসদের দিকে। তারা যেখানে যাওয়ার কথা বলেছিল, ঠিক সেই দিকেই মার্চ করে এগিয়ে গেল। আন্দোলনকারীরা যখন কাছাকাছি পৌঁছে গেল, তখন নিরাপত্তা বাহিনী তাদের একে-ফোরটি সেভেন রাইফেল নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের দিকে তাক করে অবস্থান নিল। তবুও শোলাপোকারা পিছু হটেনি, তারা মার্চ করে এগিয়ে চলল। আর তাদের এই পদযাত্রার মধ্য দিয়ে সরকারের লৌহকঠিন হাতের ওপর জড়ানো সেই মখমলের মুখোশ খসে পড়ল। সরকার আসলে কী এবং সবসময় যা ছিল, একটি ফ্যাসিবাদী লৌহমুষ্টি, তা আজ একেবারে নাঙা হয়ে খসে গেল। এটি হলো এমন একদল বর্বর মানুষের সংঘ, যাদের দেশের ইতিহাস ও বৈচিত্র্য বোঝার ন্যূনতম ক্ষমতা নেই। এরা শুধু ঘৃণা করতে জানে, কীভাবে ভালোবাসতে হয় বা চিন্তা করতে হয়, তা তাদের জানা নেই।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ছাত্র আন্দোলনেও পুলিশ চড়াও হয়েছিল। কিন্তু থামাতে পারেনি তরুণদের।
আন্দোলনকারীরা যখন একেবারে কাছে চলে এল, তখন আমাদের সাহসী ও আস্ফালনকারী প্রধানমন্ত্রীকে তড়িঘড়ি করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলো। সংসদ সদস্যরা সেই চকচকে নতুন ‘সংবিধান সংসদ’ ভবন থেকে বের হতে পারলেন না, যে ভবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো প্রতিদিন সংবিধানকে একটু একটু করে ধ্বংস করা।
সন্ধ্যার মধ্যে পুলিশ আন্দোলনস্থলের মূল মঞ্চটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। কিন্তু রাতের মধ্যেই সাধারণ মানুষ সেটি আবার পুনরুদ্ধার করে নিজেদের দখলে নিয়ে নিল। পুলিশ যখন রাতের বেলা পিছু হটল, তখন শোলাপোকার দল তাদের পেটানোর জন্য দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল (স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিল)। বাহ মোদী জি! বাহ!
এটি আশা করা বোকামি হবে যে এর মাধ্যমে কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন এসে যাবে। তবে একে কেবল একটি সাময়িক উত্তেজনাকর মুহূর্ত বলে উড়িয়ে দেওয়াটাও বোকামি হবে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, তারযুক্ত ও লাইভ-স্ক্রিমিং করা টিভি চ্যানেলগুলো এখন বৈদেশিক অনুদান এবং সিআইএ-র ষড়যন্ত্র নিয়ে নানা গুঞ্জন, কানাঘুষা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বে গরম হয়ে উঠেছে। একজন গর্বিত ‘আন্দোলনজীবী’ (মোদীজি আমাদের মতো মানুষদের যে ব্যঙ্গাত্মক নাম দিয়েছেন) হিসেবে আমি স্বীকার করছি যে, যখন এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল, আমিও কিছুটা শঙ্কিত ছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল আমরা বুঝি ২০১১ সালের আন্না হাজারের সেই কথিত দুর্নীতিবিরোধী জনআন্দোলনের দিকেই আবার এগোচ্ছি, যে আন্দোলন তার শুরুর উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আমাদের এমন এক রাজনৈতিক দলের তিন মেয়াদের শাসন উপহার দিয়েছিল, যারা দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তছনছ করে দিয়েছে। যে দল নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভারতের সরকারকে আলাদা বলে মনে করে না, যারা দেশ বা দেশের নাগরিক কাউকেই সম্মান করে না এবং যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের লজ্জিত করে ভারতকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছে।
তবে ‘শোলাপোকা জনতা পার্টি’র প্রতি আমার সেই সংশোধিত সন্দেহ দূর হয়ে গেল, যখন আমি মূলধারার গণমাধ্যমের তাদের প্রতি চরম শত্রুতা দেখলাম। সেটাই আমার কাছে প্রথম এবং সবচেয়ে আশ্বস্ত করার মতো লক্ষণ ছিল। আমি দারুণ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম যখন জানতে পারলাম যে অভিজিৎ দ্বীপকে একটি দলিত সম্প্রদায় থেকে এসেছেন, আর তার চেয়েও বেশি ভালো লেগেছে যে কেউ এই বিষয়টিকে নিয়ে বাড়তি কোনো মাতামাতি করেনি। আমার কাছে সবকিছু বদলে গেল যখন আমি তাকে বলতে শুনলাম: “আমার নাম যদি খালিদ হতো, কিংবা আমি যদি একজন মুসলমান হতাম, তবে এযাবৎকাল আমাকে জেলে পচে মরতে হতো।” ভারতের বাস্তব পরিস্থিতিটা আসলে কতটা কদর্য, তা সাহসের সঙ্গে তুলে ধরার ক্ষমতা তার ছিল, এই সত্যটা যে, আমাদের দেশে সবকিছু (বিশেষ করে আইন) সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। সবকিছু সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আপনার ধর্ম, জাতি, বর্ণ, শ্রেণি এবং লিঙ্গের ওপর। এটি অত্যন্ত সরলভাবে বলা একটি গভীর পর্যবেক্ষণ।
তিনি যখন সাহসের সঙ্গে এই কথাটি প্রকাশ্যে বললেন, যেখানে বিরোধী দলের রাজনীতিকরাও ‘হিন্দুদের রোষানলে পড়ার ভয়ে’ ‘মুসলমান’ শব্দটি উচ্চারণ না করে কেবল ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ বলে দায় সারেন, তখনই আমি সোজা যন্তর মন্তরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমি এও বুঝতে পেরেছিলাম যে, দ্বীপকে যখন ‘খালিদ’ নামটি উচ্চারণ করেছিলেন, তখন হয়তো তিনি জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক উমর খালিদের কথাই বলছিলেন, যিনি শার্জিল ইমাম এবং আরও অনেকের সঙ্গে প্রায় ছয় বছর ধরে কোনো বিচার ছাড়াই কারাগারে বন্দি রয়েছেন। উমর খালিদের অপরাধ কী? ২০২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে চলা আন্দোলনের সময় তিনি বিক্ষোভকারীদের অহিংস থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ সেই একই সময়ে হিন্দু উগ্রপন্থী গুন্ডাদের চালানো ভাঙচুর, হত্যা ও মসজিদ পোড়ানোর ঘটনায় দিল্লি যখন উত্তাল হয়ে ওঠে, যে সহিংসতা পুলিশ নীরবে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেছিল এবং মাঝেমধ্যে সহায়তাও করেছিল, তখন তিনি শান্তির কথাই বলেছিলেন। একের পর এক জামিনের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হচ্ছে এমন সব বিচারকের দ্বারা, যারা ন্যায়বিচার কোনটি তা করা তো দূরের কথা, সেটি বোঝার সাহসও হারিয়ে ফেলেছেন।
শোলাপোকারা যখন মিছিল করে এগিয়ে চলল এবং তাদের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে লাগল, তখন মনে মনে ভাবলাম: যাক বাবা, রক্ষা! এরা অধিকাংশই মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান বা আদিবাসী নয়। তা না হলে এতক্ষণে তাদের পিষে ফেলা হতো, গুলি করে মারা হতো কিংবা জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে এরা কাশ্মীরি নয়। তা না হলে তাদের অন্ধ করে দেওয়া হতো (যদিও এদের কেউ কেউ পেলেট গানের ছররা গুলির আঘাত থেকে রক্ষা পায়নি)। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে এরা মূলত হিন্দু। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক কতটা শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছালে এমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে হয়, সেটাই আজ বড় সত্য।
তবে পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। আমরা এমন এক অবস্থার মধ্যে আছি যাকে বলা হয় ‘অগ্রসরমান পরিস্থিতি’। অন্যান্য রাজ্য থেকে হাজার হাজার আধাসামরিক বাহিনী বিমানে করে নিয়ে আসার খবর পাওয়া আসছে। সামনের দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে, তা আমরা কেউ জানি না।
তাহলে এই পুরো বিষয়টি আমাদের কোথায় এনে দাঁড়াল? আন্না হাজারের সেই আন্দোলনের কথা মনে করুন, যাকে কর্পোরেট মালিকানাধীন শত শত হিস্টিরিয়াগ্রস্ত টিভি চ্যানেল দিনের পর দিন ২৪ ঘণ্টা ধরে অবিরাম কভারেজ দিয়েছিল। কিন্তু ‘শোলাপোকা জনতা পার্টি’র পাশে সেই অর্থে বড় কোনো মাধ্যম নেই; তাদের ভরসা কেবল নিজেদের শক্তি আর ইন্টারনেট। আন্না হাজারের সেই আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ভেতরে ঢুকে তা দখল করে নিয়েছিল এবং মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি গেটে পাহারা বসিয়ে টিভি-সৃষ্ট উন্মাদনার রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। কিন্তু শোলাপোকাদের পেছনে এমন কোনো সুসংগঠিত বিরোধী দল নেই যারা সুযোগ নেওয়ার জন্য ডানা গুটিয়ে বসে আছে। আমরা আজ যে স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ দেখতে পাচ্ছি, তা একসময় মিলিয়ে যাবে, যদি না প্রকৃত অর্থে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। যদি না বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা ও বিরোধী দলগুলো নিজেদের মধ্যকার কোন্দল ও ছোটখাটো দলাদলি ভুলে সংহতি প্রকাশ করে। সরকার খুব ভালো করেই জানে যে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। সরকার সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ও নির্বিকার রয়েছে কারণ তারা বিশ্বাস করে যে তাদের কেবল একটু সময়ক্ষেপণ করতে হবে। সরকারের হাতে সময় কাটানোর ক্ষমতা আছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সেই ধৈর্য বা সময় নেই।
এই মুহূর্তে শোলাপোকাদের এই অভ্যুত্থান ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান বিক্ষিপ্ত আন্দোলনগুলোর মধ্যে কেবল একটি। মধ্যপ্রদেশের আদিবাসীরা কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের প্রতিবাদ করছেন। উত্তরাখণ্ডের গ্রামবাসীরা নির্বিচারে গাছ কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। মানুষ গ্রেট নিকোবর দ্বীপের পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিবাদে সোচ্চার। মণিপুর জ্বলছে। চাকরি উধাও। দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী। ক্ষোভ ঘনীভূত হচ্ছে। আর বিজেপি-আরএসএসের ‘ভগবান’ সাজানোর খেলা আজ সবার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। এটি ছিল একটি বিরাট প্রতারণা। গুন্ডাদের দ্বারা পরিচালিত এক সোনার খনি লুটের কারবার। অযোধ্যায় রামমন্দির নিয়ে যে কাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা যেন এক নিম্নমানের বলিউড সিনেমার স্ক্রিপ্ট, যা আমাদের চোখের সামনে অভিনীত হচ্ছে। দামি পোশাকের ভণ্ড সাধু বাবা আর দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদরা হোটেল বানাচ্ছে, আবাসন ব্যবসা ফেঁদেছে, এসইউভি গাড়িতে চড়ে বেড়াচ্ছে, গরিব ও সরলপ্রাণ মানুষের অন্ধ বিশ্বাসের চর্বি খেয়ে এরা ফুলেফেঁসে উঠেছে। দুর্নীতির এই চোরাবালি আর প্রকাশ্য লুটপাটের থাবা একেবারে ওপরের তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
শোলাপোকাদের এই সম্মিলিত শক্তি কি আমাদের এই নরককুণ্ড থেকে উদ্ধার করতে পারবে? কাজটি মোটেও সহজ নয়। ভারতের গণআন্দোলনগুলোর অতীতের দিকে তাকালে ফলাফল খুব একটা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। এটি হলো ছোটখাটো উচ্চাভিলাষ এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ স্বপ্নের এক দুঃখজনক ইতিহাস। ষাট ও সত্তরের দশকে নানা আন্দোলন, যার মধ্যে নকশালদের সশস্ত্র বিদ্রোহও অন্তর্ভুক্ত ছিল, কৃষক ও চাষীদের হাতে সম্পদ ও জমি পুনর্বণ্টনের দাবি তুলেছিল। তাদের নির্মমভাবে পিষে ফেলা হয়েছিল। আশি ও নব্বইয়ের দশকে সামাজিক আন্দোলনগুলো, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’ এবং পরবর্তী সময়ে অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডের মাওবাদীরা, কৃষক ও আদিবাসীদের তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। সহজ কথায়, গরিব মানুষের হাতে যা সামান্য অবশিষ্ট ছিল, তা যেন কেড়ে নেওয়া না হয়, তারা শুধু সেটুকুই চেয়েছিল। তাদেরকেও নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়েছিল।
২০০০-এর দশকে এসে সেই লড়াই আর অধিকার আদায়ের জায়গায় রইল না, মানুষ কেবল ‘জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন’-এর মতো সামান্য ত্রাণের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা এক প্রজায় পরিণত হলো। ন্যূনতম মজুরিতে বছরে মাত্র তিন মাস কাজের অধিকার, শহরের কোনো দামি রেস্তোরাঁয় এক বেলা ভালো খাবারের বিলের সমান সেই সামান্য অর্থ। বর্তমান সরকার সেটিকেও তুলে দিয়ে তার পরিবর্তে চাল-ডালের মতো বেঁচে থাকার মতো কিছু রেশনের বস্তা ধরিয়ে দিয়েছে, যার গায়ে মোদীর বড় বড় ছবি প্রিন্ট করা থাকে। ফুটন্ত কড়াই থেকে ভিক্ষুকদের দিকে গাড়ি থেকে ছুঁড়ে দেওয়া ভিক্ষার মতো সেই ত্রাণ ছুড়ে দেওয়া হয়, যার বিনিময়ে মানুষ থেকে আনুগত্য আর ভোট আদায় করা যায়। অর্থনীতির বর্তমান ভঙ্গুর দশায় সেই সামান্য ত্রাণটুকুও এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
আজ, ২০২৬ সালে এসে আমাদের লড়াইয়ের পরিধি এতটাই সংকুচিত হয়ে গেছে যে এখন আমাদের নিজেদের ভোটাধিকার এবং নাগরিকত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়তে হচ্ছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি, এগুলো হলো নাৎসি জার্মানির ১৯৩৫ সালের নুরেমবার্গ আইনের হিন্দুরাষ্ট্র সংস্করণ, যে আইনের মাধ্যমে থার্ড রাইখ বা হিটলারের জার্মানির সুনির্দিষ্ট ‘বংশলতিকার দলিল’ বা লিগ্যাসি পেপারের ভিত্তিতে জার্মান নাগরিকদের নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা হয়েছিল। (ভারতের কত মানুষের কাছে এমন নিখুঁত দলিলপত্র আছে?) ক্যা এনআরসি বিরোধী সেই তীব্র আন্দোলন একসময় স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, যখন ব্যাপক দমনপীড়নে আন্দোলনকারীদের হত্যা এবং কর্মীদের কারাগারে বন্দি করা হয়। তবে সেই প্রতিবাদের চাপে সরকার অবশ্য নতুন আইনগুলো বাস্তবায়নের গতি কিছুটা ধীর করতে বাধ্য হয়েছিল।
কিন্তু এখন সেই ক্যা ও এনআরসি, যাকে সবাই অত্যন্ত সঠিকভাবেই মূলত মুসলমানদের বিরুদ্ধে লক্ষ্য করে তৈরি বলে বিশ্বাস করত, তা এখন ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’-এর ছদ্মবেশে আবার ফিরে এসেছে। আমাদের খুব সাধারণভাবেই জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে আমাদের পাসপোর্টগুলোও নাগরিকত্বের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। লাখ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে বাদ দেওয়া হচ্ছে। সারা দেশের মানুষ আজ পাগলের মতো সেই পুরোনো ‘বংশলতিকার দলিল’ বা লিগ্যাসি পেপার খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমরা জানি না আজ আমাদের অবস্থান কোথায়। আমরা কি এ দেশের বৈধ নাগরিক? নাকি অবৈধ? আমাদের কি কোনো অধিকার আছে? ‘সন্দেহজনক নাগরিক’দের জন্য যে বিশাল সব ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে, তার কোনটিতে আমাদের ঠাঁই হবে? আমাদের কি বাকি জীবনটা এক ট্রাইব্যুনাল থেকে অন্য ট্রাইব্যুনালে দৌড়ে কাটাতে হবে? ফ্যাসিস্টরা সবসময়ই বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি ভালোবাসে।
আমাদের এই চরম আতঙ্ক এবং যন্ত্রণাবোধ অনেক সময় শোলাপোকাদের এই অভ্যুত্থানের ওপর অতিরিক্ত আশা চাপিয়ে দিতে পারে। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই একে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সেই তরুণদের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা করছেন, যার মাধ্যমে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটে। কিন্তু ভারত তার চেয়ে অনেক বিশাল একটি দেশ, যেখানে এই মডেল হুবহু খাপ খাওয়া কঠিন। আবার অন্য কেউ কেউ একে জয়প্রকাশ নারায়ণের সেই আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছেন, যা ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। তবে এই ধরনের তুলনাগুলো খুব একটা কাজে দেবে না। ‘শোলাপোকা জনতা পার্টি’ এর কোনোটিই নয়। এটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং নিজস্ব এক ব্যাপার। এটি তার সময়ের এক অনন্য সৃষ্টি। এটি হলো একদল বিপন্ন তরুণ, যারা এমন এক নিষ্ঠুর ও প্রতিশোধপরায়ণ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, যারা বিরোধীদের ওপর সামান্যতম দয়া দেখাতেও জানে না। সরকারের তরফ থেকে বদলার পরিকল্পনা যে ইতিমধ্যেই চলছে এবং যারা এর মূল উসকানিদাতা বলে চিহ্নিত, তাদের ওপর যে খড়্গ নেমে আসবে, তা বলাই বাহুল্য।
যে সরকার ক্রমেই মারাত্মকভাবে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, তারা কোন ভরসায় নিজেদের ভোট দেওয়া সাধারণ মানুষের প্রতি সামান্য ছাড় বা ছাড় দিতেও রাজি নয়? সম্ভবত এই কারণে যে তারা বিশ্বাস করে তারা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সফলভাবে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে নিতে পেরেছে। তারা নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কব্জা করে ফেলেছে। নির্বাচন কমিশনের গঠনপ্রণালী এতটাই ত্রুটিপূর্ণ যে নিরপেক্ষতার দিক থেকে তাদের ওপর আর ভরসা করা যায় না। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএমকে নিজেদের মতো করে সাজানো হয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দিয়ে সেখানে অবাস্তব বা ভুয়া নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে আমলারা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন, তারা সরকারের সঙ্গে পুরোপুরি হাত মিলিয়েছেন। আদালতের বিচারকদের ওপর ভরসা করা যায় না কারণ তারা গুরুতর অনিয়মগুলোকে হয় দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে দেন নয়তো চোখ বুজে থাকেন। পুলিশ তো জানেই না নিরপেক্ষতা কাকে বলে। ক্ষমতাবান কেউ আঙুল সঙ্কেত করলেই সংবাদমাধ্যমগুলো নত হয়ে সেলাম ঠোকে। নির্বাচনী এলাকাগুলোকে এমনভাবে কাটাছেঁড়া ও পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে, যেন নিশ্চিত করা যায় যে সুবিধা সবসময় বিজেপির পক্ষেই থাকবে। তবে ক্ষমতাসীন দলের ভয় পাওয়ার কী আছে? তারা কেনই বা কারও কথা শুনবে? তারা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজনৈতিক দল, যাদের পেছনে পৃথিবীর শীর্ষ ধনী শিল্পপতিদের অর্থ বিনিয়োগ করা আছে। তারা যেকোনো কিছু কিনতে পারে। এবং যেকোনো মানুষকে কিনতে পারে, তারা ঠিক এমনটাই বিশ্বাস করে।
কিন্তু এই খেলা কি চিরকাল চলতে পারে? সব মানুষকে কি সবসময় বোকা বানিয়ে রাখা সম্ভব? দেড়শো কোটি মানুষের একটি দেশকে কি এভাবে চিরকাল পচা লাশের মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া যাবে? ককখনোই না। শোলাপোকারা আজ ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কৃষকরা আবারও দিল্লির দিকে মার্চ করা শুরু করেছেন, এবার তাদের প্রতিবাদ ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে, যে চুক্তিটি ভারতের সরকার কৃষকদের পিঠের চামড়া বাঁচিয়ে তাদের হয়ে দাসত্বের মতো সই করতে সম্মত হয়েছে। শহরের সীমানাগুলো সিল করে দেওয়া হয়েছে, তবে তাতেও তাদের ঠেকানো যাবে না। সম্ভবত আমাদের বাকিদেরও কৃষক এবং এই শোলাপোকাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত, কীভাবে একটু দুঃসাহসী হয়ে উঠতে হয়। তরুণেরা আমাদের একটি অমূল্য উপহার দিয়েছে। এখন আমাদের সবার দায়িত্ব, আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব, তারা যা করেছে তার যেন একটি সঠিক পরিণতি ও অর্থ থাকে।
একজন প্রধানমন্ত্রী যখন শারীরিকভাবে পালিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করেন, তখন এমন দিন খুব দূরে নয় যেদিন তাকে রাজনৈতিকভাবেও চিরতরে পালাতে হবে।
তবে এই বর্তমান শাসনব্যবস্থা এত সহজে হাল ছাড়বে না। রাজধানীর রাজপথে নিজেদের এমন জনমানসে অপমানিত হওয়া তারা সহজে মেনে নেবে না। আমাদের সামনে রক্তপাত দেখার আশঙ্কাও রয়েছে। তরুণদের মেজাজ গরম হয়ে উঠছে। ওই উত্তাল ও বিক্ষুব্ধ ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ যদি মেজাজ হারিয়ে ফেলেন এবং পুলিশকে গুলি চালানোর একটা অজুহাত তুলে দেন, তবে তা ঘটতে কতক্ষণ সময় লাগবে? তারা আমাদের ধসিয়ে দিতে সবকিছুই করবে। তাই তাদের থামানোর জন্য আমাদেরও সব কিছু করতে হবে।