গণমাধ্যমের নিবন্ধন: নিয়ন্ত্রিত অনুমতি বনাম স্বাধীন সাংবাদিকতা

লুৎফর রহমান হিমেল
8 August 2026 2:10 am
মিডিয়াকে নিবন্ধন মুক্ত না করলে সে তার স্বাধীনতা হারাবেই।

মিডিয়াকে নিবন্ধন মুক্ত না করলে সে তার স্বাধীনতা হারাবেই।

গণমাধ্যমের নিবন্ধন নামের একটি সিস্টেম চালু আছে দেশে।  সারাবিশ্বে এরকম অদ্ভূত কোনো প্রক্রিয়া নেই। অথচ এই দেশে এই নিবন্ধন নামের নিয়ন্ত্রণ মহাসমারোহে বলবৎ আছে।  এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ল আমার।

এক গ্রামে শালিস বৈঠক চলছে। হঠাৎ এক গ্রামবাসী দাঁড়িয়ে মোড়লকে বিনয়ের সাথে বললেন, “হুজুর, আপনি যদি দয়া করে অনুমতি দেন, তবে আপনার পিঠে আমি গোটা দুই বাড়ি মারবার চাই!”

শুনতে হাস্যকর এবং অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বাংলাদেশের গণমাধ্যম ব্যবস্থার বাস্তবতা অনেকটা এই গল্পের মতোই।  যে প্রতিষ্ঠানের কাজই হলো ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্ন করা, দুর্নীতির সমালোচনা করা, সেই সমালোচনার লক্ষ্য অনেকটাই বিভিন্ন সময়ের ক্ষমতাসীন সরকাররাই। সেই প্রতিষ্ঠানকেই যদি চলতে হয় সরকারের অনুমতি নিয়ে, তাহলে কেমনে কি?

সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময় এই অদ্ভুত নিয়মটি আমার মনে এক গভীর দ্বিধা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল।  আজও সেই প্রশ্নের উত্তর হাতড়ে বেড়াই, যাকে বস্তুনিষ্ঠতার সত্য দিয়ে শাসন করার কথা, তার কাছ থেকেই যদি শাসনের অনুমতি নিতে হয়, তবে সেই সাংবাদিকতা কতটা স্বাধীন হতে পারে?

এমনিতেই ছাপা পত্রিকার প্রচার সংখ্যা নিয়ে হাস্যরসের শেষ নেই। ওয়েজবোর্ডের কথা বলে পত্রিকাগুলো মনগড়া ছাপাসংখ্যার ঘোষণা দেয়।  যারা দুই হাজার কপি ছাপে, তারা সরকারের কাছে ঘোষণা করে যে তারা ১ লাখ ৪০ হাজার কপি ছেপে থাকে।  এবং কর্মীদের ওয়েজবোর্ড অনুসারে বেতন-ভাতা দেয়। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যায় একবছরের বেতন বকেয়া।

আমি এমন একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলাম যেখানে দুই হাজার কপি ছাপা হতো, অথচ মালিকপক্ষ ঘোষণা দিত এক লাখ ৩৪ হাজার কপির! একবার ভাবুন সত্য নিয়ে কারবার যেসব গণমাধ্যমের, তাদেরই যদি সত্যের এই হাল হয়, সমাজের বাকি সিস্টেম কী হালে আছে?

এসব কারণে দেশে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিদারুণভাবে কমে গেছে।  একটি কথা মনে রাখতে হবে, বিশ্বাসযোগ্যতাই গণমাধ্যমের প্রাণ।  বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকলে সেই গণমাধ্যমের কোনো দাম নেই।  বিশ্বাসযোগ্যতা যে কি, সেটি হাড়ে হাড়ে বুঝেছিল বোধ করি সাবেক সোভিয়েত দেশের নাগরিকরা।  সেখানকার স্থানীয় পত্রিকা নিয়ে বিস্তর কৌতুক প্রচলিত আছে।  সেসব থেকে দু-চারটা নিয়ে কথা বলার লোভ সামলাতে পারলাম না।

শতবর্ষেরও বেশি সময় আগেকার কথা। সোভিয়েত রাশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী সরকারি মুখপত্র ছিল তখন প্রাভদা। রুশ ভাষায় প্রাভদা শব্দের অর্থই ‘সত্য’। আরেকটি বহুল প্রচারিত সরকারি পত্রিকা ছিল ইজভেস্তিয়া। যার অর্থ ‘সংবাদ’। কিন্তু সোভিয়েত আমলে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রচারযন্ত্র নিয়ে মানুষের মধ্যে এমন এক গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে, এই দুই পত্রিকার নাম নিয়েই জন্ম নেয় ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত রাজনৈতিক কৌতুক। সেই ব্যঙ্গ-রসিকতাটি ছিল এরকম:

ইন প্রাভদা দেয়ার ইজ নো নিউজ, এন্ড ইন ইজভেস্তিয়া দেয়ার ইজ নো ট্রুথ। অর্থাৎ, প্রাভদায় কোনো খবর নেই, আর ইজভেস্তিয়ায় কোনো সত্য নেই।

পত্রিকা দুটির সত্যহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সাধারণ নাগরিকরাও আড়ালে মজা করতেন পত্রিকা দুটি নিয়ে। এরকম একটি কৌতুক এরকম:

আচ্ছা, আজ কি বৃষ্টি হবে? অন্যজন হয়তো পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলতেন, আবহাওয়া নিয়ে প্রাভদা কী লিখেছে সেটা আগে বল? যদি প্রাভদা লিখে থাকে আকাশ একদম পরিষ্কার। তাহলে আর কথা নেই, বৃষ্টি হবেই হবে, ছাতা নিয়ে বের হও।

আরেকটি কৌতুক:

এক বৃদ্ধ প্রতিদিন প্রাভদা কিনতেন।

দোকানদার একদিন কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

— আপনি তো পড়েন না, শুধু প্রথম পাতা দেখেই চলে যান, এটা করেন কেন?

বৃদ্ধ বললেন,

— আমি একটা মৃত্যুসংবাদ খুঁজি।

— কার?

— যে লোকগুলো এই খবরগুলো বানায়, তাদের কারও।

মানে বৃদ্ধ লোকটি এতটাই ক্ষেপে গেছেন যে, সাংবাদিকের মৃত্যু সংবাদ কামনা করছেন।

পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকলে সত্যপ্রত্যাশী পাঠকের মনের দশা এমনই হয়।

এ ত গেল পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আলাপ।  এমনিতেই পত্রিকার পাতায় সত্য খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে যদি সরকারই নিবন্ধন নামের নিয়ন্ত্রণ কাঠি নিজেদের হাতে রেখে দেয়, মিডিয়া কীইবা সত্য লিখবে? সত্য বলতে সাহস পাবে কি তারা? পাবার কথা না। চলুন এ নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলা যাক। আমার মনে হয় দেশের গণমাধ্যমগুলোর সত্যিকারের স্বাধীনতার জন্য এই নিবন্ধন ও অনুমোদন সিস্টেম বাতিল করা দরকার।  যার অর্থকড়ি থাকবে সে পত্রিকা করবে, টিভি চ্যানেল করবে।  সরকারের এখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।  ডিসিপ্লিন যদি আনতে হয়, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হতে পারে তার জন্য।

লাইসেন্সিং প্যারাডক্স: অনুমোদনের গোলকধাঁধা

তাত্ত্বিকভাবে গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। এর অন্যতম প্রধান কাজ হলো সরকারকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।  কারণ, ক্ষমতার মসনদে বসলে মানুষ অনেক সময় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে; দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতা তখন ডালভাত হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু বাংলাদেশে গণমাধ্যম চালুর জন্য সরকার বা সরকারি দপ্তরের কাছ থেকে নিবন্ধন নেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাকে এক কথায় বলা হয় ‘লাইসেন্সিং প্যারাডক্স’ বা ‘অনুমোদনের কূটাভাস’। আপনি যে প্রশাসনের দুর্নীতির ফাইল ওপেন করার কথা ভাবছেন, সেই প্রশাসনই যখন আপনার লাইসেন্সের চাবিকাঠি ধরে রাখে, তখন আপনার কলমের ওপর এক অদৃশ্য খড়গ ঝুলে থাকে। ৫৪ বছর ধরে চলে আসা এই নিয়মটি আদতে স্বাধীন সাংবাদিকতার টুটি চেপে ধরার একটি মোক্ষম অস্ত্র।

বিশ্ব প্রেক্ষাপট: তারা কীভাবে নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা করে

উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা অনুমোদনের ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক নয়, বরং প্রশাসনিক ও কারিগরি।  নিচে বিশ্বের প্রধান কয়েকটি দেশের চিত্র তুলে ধরা হলো:

যুক্তরাষ্ট্র: সংবিধানের রক্ষাকবচ আমেরিকায় সংবাদপত্র বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য সরকারের কাছ থেকে কোনো লাইসেন্স নিতে হয় না। এটি মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী দ্বারা সুরক্ষিত। সেখানে যে কেউ চাইলেই একটি প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়া চালু করতে পারে, কেবল ব্যবসার সাধারণ নিবন্ধন (ট্রেড লাইসেন্স) থাকলেই চলে।  টিভি বা রেডিওর ক্ষেত্রে তরঙ্গ (স্পেক্ট্রাম) বরাদ্দের জন্য এফসিসি (ফেডারেল কমিউনিকেশন্স কমিশন্স) কাজ করে, যা কংগ্রেসের কাছে দায়বদ্ধ একটি স্বাধীন সংস্থা।  তারা কখনো কন্টেন্ট সেন্সর করে না, বরং কারিগরি শৃঙ্খলা বজায় রাখে।

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ: মৌলিক অধিকারের মর্যাদা ইউরোপীয় ইউনিয়নে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার।  যুক্তরাজ্যে সংবাদপত্রের কোনো সরকারি নিবন্ধন লাগে না। তারা আইপিএসও নামের একটি স্ব-নিয়ন্ত্রিত সংস্থার মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের তদারকি করে।  সম্প্রচার মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে, যা সরকারের চেয়ে জনগণের কাছে বেশি দায়বদ্ধ।  সরকারের সমালোচনার দায়ে সেখানে লাইসেন্স বাতিলের কোনো নজির নেই।

কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া: সীমিত সরকারি ভূমিকা কানাডায় সংবাদপত্র সম্পূর্ণ লাইসেন্সমুক্ত। সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ করে সিআরটিসি, যা একটি স্বাধীন প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল।  একইভাবে অস্ট্রেলিয়াতে সংবাদপত্র স্বাধীন এবং লাইসেন্সমুক্ত। সেখানে এসিএমএ নামের কর্তৃপক্ষ কেবল কারিগরি দিক দেখে।  সরকার চাইলেই সেখানে কোনো গণমাধ্যম বন্ধ করতে পারে না; দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও গণশুনানি ছাড়া সেটি একেবারেই অসম্ভব।

ভারত: কাঠামোগত ভিন্নতা ভারতের ব্যবস্থা বাংলাদেশের কাছাকাছি মনে হলেও সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।  সংবাদপত্রের নাম নিবন্ধিত হয় আরএনআই -এর কাছে, যা মূলত একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।  এছাড়া প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (পিসিআই) নামক একটি আধা-বিচারিক সংস্থা সংবাদপত্রের মানদণ্ড বজায় রাখে।  বাংলাদেশে তথ্য মন্ত্রণালয় যে একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করে, ভারতে তার চেয়েও অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে গণমাধ্যম।

মূল পার্থক্যের জায়গা: কারিগরি বনাম রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ

উন্নত বিশ্বে গণমাধ্যমের নিবন্ধন ব্যবস্থা প্রধানত দুটি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে:

স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট: যেহেতু বাতাসে তরঙ্গ সীমিত, তাই বিশৃঙ্খলা এড়াতে কারিগরি অনুমতি প্রয়োজন।  এটি কোনোভাবেই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম নয়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: ঐসব দেশে বিচার বিভাগ এতটাই স্বাধীন যে, কোনো গণমাধ্যম যদি সরকারের সমালোচনার কারণে রোষানলে পড়ে, তবে আদালত তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে দেয়।

আমাদের মুক্তি কোথায়?

গণমাধ্যম কীভাবে সরকারের সমালোচনা করবে যদি তার প্রাণভোমরাটি সরকারের হাতেই বন্দি থাকে? উন্নত বিশ্বে গণমাধ্যম কোনো ব্যক্তি বা দলের মুখাপেক্ষী নয়, বরং আইনের মুখাপেক্ষী।  সেখানে অনুমতি একবার পাওয়ার পর তা বাতিল করা প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, আমাদের দেশে ‘অনুমতি’ বা ‘নিবন্ধন’ শব্দটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বা ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা মুক্ত সাংবাদিকতার পথে প্রধান অন্তরায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্যারাডক্স থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো একটি ‘সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত মিডিয়া কমিশন’ গঠন করা। যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কেবল পেশাদারিত্বের নিরিখে কাজ করবে। তবে আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে দখলদারি আর দমন-পীড়নের ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে এমন একটি কমিশন গঠন করা কতটা সম্ভব, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যতক্ষণ পর্যন্ত গণমাধ্যম সরকারের ‘দয়া’র ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততক্ষণ ‘স্বাধীন গণমাধ্যম’ শব্দটি কেবল কাগুজে বুলি হিসেবেই রয়ে যাবে।

লেখক: সম্পাদক, প্রিয়দেশ