জামায়াতের বাঘের পিঠে সওয়ার তারেক রহমান?

নিজস্ব প্রতিবেদক
21 August 2026 6:17 pm
বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটি দৃশ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় যে দুই দল একই জোটে থেকে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছে, সেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আজ একই রাজনৈতিক পরিসরে থাকলেও তাদের অবস্থান আর আগের মতো সরল নয়। বরং ক্ষমতার পালাবদলের পর সম্পর্কটি দাঁড়িয়েছে সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা এবং পারস্পরিক দূরত্বের এক জটিল সমীকরণে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে, আর জামায়াত সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। ফলে জামায়াতকে এখন আর কেবল বিএনপির সাবেক জোটসঙ্গী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তারা নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি ও সংসদীয় উপস্থিতি নিয়ে আলাদা একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো, জামায়াতকে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখবেন, নাকি প্রয়োজনের সময়ে সহযোগী হিসেবে রাখবেন?

কারণ রাজনীতিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্ক হলো সেই সম্পর্ক, যেখানে দুই পক্ষ একই পথে হাঁটে, কিন্তু তাদের গন্তব্য এক নয়।

বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের ইতিহাস নতুন নয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তারা একই সরকারে ছিল। কিন্তু সেই সময়ের অভিজ্ঞতা যেমন তাদের পারস্পরিক রাজনৈতিক সক্ষমতা দেখিয়েছে, তেমনি দুই দলের আদর্শগত ও কৌশলগত পার্থক্যও স্পষ্ট করেছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াত জোট বা ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠনের আগ্রহ দেখালেও তারেক রহমান প্রকাশ্যে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, জামায়াত যদি বিরোধী দলে থাকে, তাহলে তারা একটি কার্যকর বিরোধী শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে।

এই বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ এতে বোঝা যায়, বিএনপি নেতৃত্ব অন্তত নির্বাচনী পর্যায়ে জামায়াতকে নিজের সরকারের অংশীদার করার পরিবর্তে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখতে চেয়েছিল।

কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা সবসময় ঘোষণার চেয়ে জটিল।

নির্বাচনের পরও দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। তারেক রহমান জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। পরে জামায়াত আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানেও তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

অর্থাৎ সম্পর্কটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়।

বরং বলা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সহযোগিতা একই সঙ্গে চলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে কোনো শক্তিকে সাময়িকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু একটি শক্তিশালী সংগঠনকে ব্যবহার করতে গিয়ে যদি সেই সংগঠনও আপনাকে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন সম্পর্কটি আর একতরফা থাকে না।

জামায়াতের রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাঠামো, আদর্শিক কর্মীভিত্তি এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠন। ফলে বিএনপি যদি মনে করে, প্রয়োজনের সময় জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি নেবে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তাদের প্রভাব বাড়তে দেবে না, তাহলে সেটি বাস্তবে কতটা সম্ভব হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

কারণ জামায়াতও নিছক সহযোগী হিসেবে রাজনীতি করছে না।

২০২৬ সালের নির্বাচনে তারা ৬৮টি আসন পেয়েছে বলে নির্বাচনী ফলাফলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তারা এখন জাতীয় সংসদে একটি দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী বিরোধী শক্তি।

এই জায়গাটিই আগের পরিস্থিতির সঙ্গে পার্থক্য তৈরি করেছে।

আগে জামায়াত ছিল বিএনপির জোটের অংশ। এখন তারা বিএনপির পাশাপাশি দাঁড়ানো একটি পৃথক রাজনৈতিক শক্তি।

বিএনপির জন্য ঝুঁকি কোথায়?

প্রথম ঝুঁকি আদর্শগত।

বিএনপি নিজেকে জাতীয়তাবাদী ও তুলনামূলক মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। অন্যদিকে জামায়াতের নিজস্ব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। ফলে দুই দলের রাজনৈতিক ভাষা ও অগ্রাধিকারে পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক।

এই পার্থক্য যতক্ষণ বিরোধী রাজনীতির পর্যায়ে থাকে, ততক্ষণ তা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে এটি যদি নীতিগত সংঘাতে রূপ নেয়, তখন পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

দ্বিতীয় ঝুঁকি আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে বিএনপিকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাত্রা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠলে তার রাজনৈতিক মূল্য বিএনপিকেই দিতে হবে।

তৃতীয় ঝুঁকি ভোটের রাজনীতি।

জামায়াত যদি নিজস্ব ভোটব্যাংক ও সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা বিএনপির ওপর নির্ভরশীল সহযোগী না হয়ে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।

আর চতুর্থ ঝুঁকি নীতিনির্ধারণে চাপ।

বিরোধী দল যত শক্তিশালী হবে, সরকারকে তত বেশি জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে। জামায়াত যদি সংগঠিত বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তাহলে বিএনপি সরকারের প্রতিটি নীতির ওপর তাদের রাজনৈতিক চাপ বাড়বে।

সাম্প্রতিক ঘটনাতেও তার ইঙ্গিত দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন নিয়ে জামায়াত আমির সরকারের সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। অর্থাৎ সংসদের বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত ইতোমধ্যেই সরকারকে প্রশ্ন করার অবস্থান নিচ্ছে।

তবে বিএনপির জন্য এটিই কি শুধু বিপদ?

না।

জামায়াতের জন্যও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক একটি কৌশলগত বাস্তবতা।

বিএনপি বর্তমানে সরকারে এবং সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায়। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপিকে উপেক্ষা করে জামায়াতের জন্য দ্রুত বিস্তার ঘটানোও সহজ নয়।

এখানে দুই পক্ষের স্বার্থ তাই পরস্পরকে স্পর্শ করে। বিএনপির প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

জামায়াতের প্রয়োজন নিজের রাজনৈতিক পরিসর বাড়ানো। বিএনপির প্রয়োজন বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সংঘাত কমানো।

জামায়াতের প্রয়োজন নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখা। এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় যতদিন সম্ভব হবে, সম্পর্ক ততদিন নিয়ন্ত্রিত থাকবে।

কিন্তু স্বার্থের সংঘাত যত বাড়বে, সম্পর্কের চাপও তত বাড়বে।

তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

তারেক রহমানের জন্য চ্যালেঞ্জ তাই জামায়াতকে কাছে রাখা বা দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়।

চ্যালেঞ্জ হলো, সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা।

তিনি যদি জামায়াতকে সম্পূর্ণ শত্রু হিসেবে দেখেন, তাহলে একটি শক্তিশালী বিরোধী শক্তিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আরও কঠোর অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হলো।

আবার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হলে বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এই ভারসাম্যই সবচেয়ে কঠিন।

তারেক রহমান ইতোমধ্যে সরকার ও রাজনীতিতে বৃহত্তর ঐক্য ধরে রাখার কথা বলেছেন। জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকেও তিনি ঐক্য ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু ঐক্য আর রাজনৈতিক নির্ভরতা এক জিনিস নয়।

সহযোগিতা করা যায়। নির্ভরশীল হওয়া যায় না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতকে এখন আর কেবল বিএনপির ছায়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আবার বিএনপিকেও জামায়াতের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে সরলভাবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে।

দুই দলই এখন একই রাজনৈতিক মাঠে নিজেদের জায়গা শক্ত করার চেষ্টা করছে।

সুতরাং আগামী দিনের প্রশ্ন সম্ভবত বিএনপি-জামায়াত একসঙ্গে থাকবে কি না, তা নয়।

প্রশ্ন হলো,

কে কাকে কতটা প্রভাবিত করতে পারবে?

তারেক রহমান কি জামায়াতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখেও জাতীয় ঐকমত্য ও স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারবেন?

নাকি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতা ধীরে ধীরে এমন এক নির্ভরতায় পরিণত হবে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার মূল্য অনেক বেশি?

রাজনীতির বাঘের পিঠে ওঠা যতটা কঠিন, সঠিক সময়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নামতে পারাটাই তার চেয়ে বড় রাজনৈতিক দক্ষতা।

আর আগামী কয়েক বছর সম্ভবত সেই দক্ষতারই পরীক্ষা নেবে তারেক রহমানকে।