তারেক রহমানকে সফরে নিতে তোরজোর দিল্লির

নিজস্ব প্রতিবেদক
15 August 2026 3:24 am
ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের এই সম্ভাব্য অংশগ্রহণই হতে পারে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম ভারত সফর।

ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের এই সম্ভাব্য অংশগ্রহণই হতে পারে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম ভারত সফর। ছবি: এপি/পিটিআই

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগামী সপ্তাহেই নয়াদিল্লি সফরে নিতে তোরজোর করছে ভারত। সফরের জন্য ২১ ও ২২ আগস্টের তারিখ প্রস্তাব করেছে নয়াদিল্লি। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ কর্মসূচির কারণে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সফর হলে সেটি বেশি সুবিধাজনক হবে। দুই দেশের মধ্যে এখন সফরের তারিখ চূড়ান্ত করতে আলোচনা চলছে।

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে তাঁর প্রথম ভারত সফর। সফরটি নিয়ে দুই দেশই প্রস্তুতি শুরু করেছে। দিল্লির আগ্রহের পেছনে সময়ের হিসাবটাও গুরুত্বপূর্ণ। আগস্টের শেষ দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তান সফরের কথা রয়েছে। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনেও যোগ দেবেন তিনি। তাই তার আগেই তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করতে চায় নয়াদিল্লি।

ঢাকার হিসাব অবশ্য একটু আলাদা। ২০ আগস্ট বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে আগস্টের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর জন্য সময় বের করা কঠিন হতে পারে। এ কারণেই সেপ্টেম্বরের প্রথম দিককে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছে ঢাকা।

ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও শুক্রবার ঢাকায় ফিরছেন। সপ্তাহান্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক মহলের নজর এখন সেই বৈঠকের দিকে। সফরের তারিখ চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তারেক রহমানকে ভারত দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ দিয়েছিল ফেব্রুয়ারিতেই। পরে তাঁকে সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ার হওয়ায় এই আমন্ত্রণ পেয়েছে। তবে ঢাকার পছন্দ শুধু কোনো বহুপক্ষীয় সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক নয়। বাংলাদেশ চায় আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফর, যেখানে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সরাসরি এবং বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।

এখানেই সফরটির রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ছে।

দুই দেশের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে বেশ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এখনো ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চাইছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করছে।

সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। ঢাকার অভিযোগ, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ভারত অবশ্য ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে।

এই পরিস্থিতিতেই ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি “অনুকূল পরিবেশ” তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। বিষয়টি শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না, বরং সম্পর্কের বরফ গলানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরে তাই শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য থাকবে না। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, ভিসা এবং দুই দেশের মানুষের যোগাযোগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

বিশেষ করে পানি নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ অনেক বেশি। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ১১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। এর আগে নতুন চুক্তি বা পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করা ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতাও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বড় জায়গা। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশ ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দিকেও এগোচ্ছে।

ভারতের দিক থেকেও তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে চাইছে নয়াদিল্লি। অন্যদিকে ঢাকার জন্যও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এমন পর্যায়ে নেওয়া দরকার, যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি বা নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আটকে না দেয়।

তাই সফরের তারিখ নিয়ে যে টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে, সেটিকে নিছক ক্যালেন্ডারের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভারত চাইছে দ্রুত বৈঠক। ঢাকা চাইছে প্রস্তুতি নিয়ে, নিজেদের অগ্রাধিকার পরিষ্কার করে দ্বিপক্ষীয় সফরটি করতে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, ২১ ও ২২ আগস্ট তারেক রহমান দিল্লি যাচ্ছেন, নাকি সফর গড়াবে সেপ্টেম্বরের শুরুতে? এ মুহূর্তে কোনো তারিখই চূড়ান্ত হয়নি। তবে দুই দেশের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে এবং আগামী কয়েক দিনের আলোচনাতেই বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।

তারিখ যেটিই হোক, এই সফর বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে। আর দিল্লির জন্যও এটি হবে তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের ভিত্তি কতটা শক্তভাবে তৈরি করা যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

সূত্র: দ্য প্রিন্ট ও রয়টার্স।