নীল জোছনার রহস্যময় আলোয় ভেসে থাকা লালবাগের কেল্লা, ইতিহাসের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিমান্বিত স্থাপনা। এই কেল্লার শানবাঁধানো পুকুরের স্বচ্ছ জলে যেন আজও প্রতিধ্বনিত হয় এক অজানা প্রেমের গল্প। সত্যি নাকি কল্পনা, তার সঠিক উত্তর পাওয়া কঠিন কিন্তু সেই রহস্যের ভেতর দিয়েই উদ্ভাসিত হয় “শায়েস্তা খাঁ’র পরী”।
ঐতিহাসিক ফিকশন ঘরানার এই নাটকটি নির্মিত হয়েছে ইসমাইল হোসেনের শক্তিশালী উপন্যাস অবলম্বনে। ছোট জলা আর এবড়ো-থেবড়ো মাঠের ওপর দ্রুত উঠে দাঁড়ানো লালবাগ কেল্লার নির্মাতা ছিলেন শাসক শায়েস্তা খাঁ। কিন্তু এই স্থাপত্য শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয়, বহন করে এক অদ্ভুত, অদৃশ্য আবেশ। কেল্লার পুকুরে নীল জোছনায় সাঁতার কাটে এক নগ্নিকা পরী, কিংবদন্তির চরিত্র, না কি সত্য ইতিহাসের অদেখা অংশ? সেই পরীর সঙ্গে দেখা যায় এক যুবককে। তার নাম পাটু। পাটু আর পরীর সম্পর্ক কি সত্যিকারের প্রেম, নাকি ইতিহাসের অন্দরে লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো রহস্য? এই প্রশ্নই নাটকটির কেন্দ্রে।
ইসমাইল হোসেন তাঁর উপন্যাসে তুলে এনেছেন আমাদের সভ্যতার বিস্মৃত ইতিহাস, যে ইতিহাস জলদস্যু, মারাঠা, আরাকান, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো শক্তির নিষ্ঠুরতা ও রাজনৈতিক চক্রান্তে ভরপুর। একদিকে শায়েস্তা খাঁর শাসন, অন্যদিকে ইতিহাসের অনালোচিত বীর পাটুর সংগ্রাম, জয়-পরাজয়ের এই মহারণে মানবিক অনুভূতির সূক্ষ্ম রেখাগুলো ফুটে ওঠে তীব্রতর ভাবে। পরী যেন এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক সত্তা, যার মনে হাজার প্রশ্ন কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?
উপন্যাসটিকে নাট্যরূপ দিয়েছেন আবু সাঈদ তুলু। তাঁর নাট্যরূপ ইতিহাসকে যেমন অক্ষুণ্ণ রেখেছে, তেমনি যোগ করেছে নাট্যমঞ্চের প্রাণ ও আবেগ। নির্দেশনায় রয়েছেন এ সময়ের তরুণ প্রতিভাবান নির্দেশক শুভাশীষ দত্ত তন্ময়, যিনি এই প্রযোজনায় যুক্ত করেছেন আধুনিক মঞ্চভাষা, সূক্ষ্ম শৈল্পিক চিন্তা এবং ভিজ্যুয়াল সিম্বোলিজম।
মেঘদূত নাট্য সম্প্রদায়ের ২১তম প্রযোজনা হিসেবে এই নাটকটি শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে ২৩ সেপ্টেম্বর বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ৩য় প্রদর্শনী। এ নাটকে অভিনয়ে করেছেন-শুভাশীষ দত্ত তন্ময়, রেখা রানী গুণ, জয়া আহমেদ, দীপু মাহমুদ, শান্তনু সাহা, হামিদুর রহমান পাপ্পু, আশীষ চক্রবর্তী, সুধাংশু নাথ, আলমগীর হোসেন, মীরা, পার্থ দেবনাথ, শিউলী ইসলাম, মুরাদ, মো: আনিস, নয়ন, রায়হানের মতো নিবেদিতপ্রাণ নাট্যশিল্পী।
মঞ্চ পরিকল্পনায় ফজলে রাব্বি সুকর্ণ নাটকটিকে দিয়েছেন এক অনন্য দৃষ্টিনন্দন রূপ। আলোক পরিকল্পক পলাশ হেনড্রী সেন আলোর ঘোর তৈরি করবেন নির্দ্বিধায়। পোশাক পরিকল্পনায় আইরিন পারভীন লোপা নির্মাণ করেছেন চরিত্রভিত্তিক নান্দনিক ভিজ্যুয়াল। সংগীতে হামিদুর রহমান পাপ্পুর সুরধ্বনি দর্শককে নিয়ে যাবে ১৭শ শতকের আবহে, ইতিহাসের গভীরে, রহস্যের ভেতর।
“শায়েস্তা খাঁ’র পরী” শুধু একটি নাটক নয়- এটি ইতিহাস, কিংবদন্তি, প্রেম ও সংঘাতের এক বুনন। মানুষের প্রশ্ন, ক্ষমতার রাজনীতি, লুকিয়ে থাকা অনুভূতি আর সময়ের তীব্র গতির ভেতর দিয়ে এই নাটক দর্শককে নিয়ে গেছে এক অন্য জগতে।
একটি কেল্লা, একজন শাসক, এক হারানো প্রেম আর একটি ইতিহাসের অদেখা স্তর এই চারটি সূত্র মিলেই গড়ে উঠেছে “শায়েস্তা খাঁ’র পরী” নামে এক মনোমুগ্ধকর নাট্যমুহূর্ত।