সাজা মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা দিচ্ছেন ফেরার ডাক

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
21 September 2026 5:27 pm
শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায়, দলীয় নিষেধাজ্ঞা ও তৃণমূলের কোণঠাসা অবস্থা, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে চরম অস্বস্তিতে আওয়ামী লীগ। এমন এক পটভূমিতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত দলের উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠক আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ অঙ্গনে তৈরি করেছে নতুন কৌতুহল।

মৃত্যুদণ্ডের রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত দাবি করে তা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি, সাজা মাথায় নিয়েই দেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে সংকটকালীন এই সময়ে দলের হাল ধরতে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে শীর্ষ নেতৃত্বে আনার জোর দাবি উঠেছে দলের অভ্যন্তরে।

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর আলোচনা ছিল। দিল্লির সোয়াইন ফ্লু ও ডেঙ্গি পরিস্থিতি এবং ভারত ও বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নেতাদের উপস্থিতি সহজ করতে শেষ পর্যন্ত মুখোমুখি বৈঠকটি রূপ নেয় অনলাইন অধিবেশনে। এতে কলকাতা থেকে যুক্ত ওবায়দুল কাদেরের পাশাপাশি ইউরোপ ও আমেরিকা থাকা কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা অংশ নেন।

সভার শুরুতে ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত সাজাকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের সিদ্ধান্ত’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন দলের নেতারা। সেখানে শেখ হাসিনা স্পষ্ট জানান, তিনি আইন বা সাজাকে ভয় পান না এবং যেকোনো পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশে ফিরতে প্রস্তুত, যদিও বর্তমান প্রশাসন তাঁর ফেরার পথে নানা প্রশাসনিক বাধা সৃষ্টি করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

বৈঠকে রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি দলের ভেতরের সাংগঠনিক পুনর্গঠন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাদের প্রতি নির্দেশ দেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত কয়েক মাসে যেসব নেতা-কর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, শূন্য পদগুলোতে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোকে সামনে রেখে জনমত গঠনে ৯ দফাভিত্তিক কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় প্রাণ হারানো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নাম ও তথ্য সংগ্রহ করে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

তবে এই সেশনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল দলের ভবিষ্যৎ শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী আলোচনা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই সংকটময় মুহূর্তে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে নীতি-নির্ধারণী পদে আনা জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তিবিদ জয় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় দলের মূল মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ায় সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিতে আর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বাধা নেই। শেখ হাসিনা আগেও একাধিকবার নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নেতৃত্ব আসার কথা বললেও, দলের অস্তিত্ব রক্ষার এই পর্যায়ে পুত্র ও কন্যাকে সামনে আনার বিষয়ে নমনীয় হওয়ার জোরালো সংকেত পাওয়া যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে বসে পুরো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে সচল করা এবং মৃত্যুদণ্ডের তোয়াক্কা না করে শেখ হাসিনার ফিরে আসার ঘোষণা প্রমাণ করে, দলের রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত লড়াইয়ের দিকেই এগোচ্ছে। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক আইনি বাধা পেরিয়ে এ ঘোষণা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে এবং নতুন নেতৃত্ব মাঠের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক গতিপথের ওপর।