দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশও কি যুক্ত হতে যাচ্ছে? বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে ইতিবাচক মনোভাবের কথা প্রকাশ্যে আসার পরই বিষয়টি নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে ওঠা এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর সম্ভাব্য বিস্তার ভারতের পূর্ব সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে।
গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির মূল ধারণা হলো, তিন দেশের কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই কাঠামোর কারণেই অনেকে এটিকে ন্যাটোর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন। এ হিসেবে এই চুক্তিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবেও অভিহিত করছেন। তবে এটিকে এখনই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা কিছুটা অতিরঞ্জিত হবে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন। ন্যাটোর মতো এর কোনো সমন্বিত সামরিক কমান্ড, অভিন্ন বাজেট বা দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো নেই।
বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টি সামনে আসে ২৫ আগস্ট। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই কাঠামোয় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে ঢাকার ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ঢাকার জন্য এর সম্ভাব্য সুবিধাও কম নয়। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা একসঙ্গে বাংলাদেশের জন্য নতুন ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
তবে এই সমীকরণের সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি হলো ভারত। দিল্লি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে কৌশলগত দৃষ্টিতে দেখছে। কারণ এই চুক্তির একটি প্রতিষ্ঠাতা দেশ পাকিস্তান। বাংলাদেশ যদি এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হয়, তাহলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নিরাপত্তা হিসাবেও নতুন একটি মাত্রা যুক্ত হবে। ভারতের উদ্বেগের জায়গা শুধু পাকিস্তান নয়, তুরস্কের সামরিক সম্পর্ক এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে এই জোটের সমন্বয়ও।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, মক্কা চুক্তিকে সরাসরি ভারতবিরোধী বা কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সামরিক জোট হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। চুক্তির ভাষায় মূল বিষয় হলো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকি এই জোট তৈরির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ফলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রশ্নটি শুধু ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের জন্য আরও বড় প্রশ্ন হলো তার দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। ঢাকা একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। আবার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। তুরস্কের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে। ফলে মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে একদিকে নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চাপও বাড়বে।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান ও সৌদি আরব ২০২৫ সালেই একটি পৃথক কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল। নতুন মক্কা চুক্তি সেই সম্পর্ককে তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে এটি হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো উদ্যোগ নয়। বরং গত কয়েক বছরের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়েই এর বিস্তার ঘটছে।
বাংলাদেশ এখন যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সিদ্ধান্তটি কেবল সামরিক সহযোগিতার প্রশ্ন নয়। এটি একই সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য, শ্রমবাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। তাই ঢাকার সামনে মূল প্রশ্ন হবে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ কী পাবে এবং এর বিনিময়ে কী ধরনের কূটনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ এখনো মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। দরজা খোলা রাখা হয়েছে। আর সেই খোলা দরজাই ইতিমধ্যে দিল্লির কূটনৈতিক মহলে নতুন হিসাব শুরু করে দিয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, আনন্দবাজার পত্রিকা, ইন্ডিয়া টুডে, দ্য ডেইলি সাবাহ, আনাদোলু এজেন্সি এবং দ্য উইক।