শেখ হাসিনাকে কি ফেরত পাঠাতে পারবে ভারত?

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
19 August 2026 5:00 pm
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে দিল্লির দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার। একই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের সফর নিয়েও আলোচনা চলছে। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন শুধু আইনি বিষয় নয়, দুই দেশের সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ভারতের খ্যাতনাম গণমাধ্যমে দ্য প্রিন্টে।

দ্য প্রিন্টের ওই বিশ্লেষণেও মূল প্রশ্নটি তোলা হয়েছে, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ চাইলে ভারত কি আইনগতভাবে শেখ হাসিনাকে ঢাকার হাতে তুলে দিতে বাধ্য? নাকি ভারতের হাতে এমন কিছু আইনি সুযোগ আছে, যার ভিত্তিতে তারা অনুরোধটি প্রত্যাখ্যানও করতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে থাকা ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি। চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে পলাতক আসামি বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ফেরত পাঠানোর আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাতেও বাংলাদেশকে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তির প্রথম দিকের ধারায় বলা হয়েছে, দুই দেশের কোনো একজন নাগরিক অন্য দেশে অবস্থান করলে এবং তার বিরুদ্ধে এমন অপরাধের অভিযোগ বা সাজা থাকলে, যা দুই দেশের আইনেই কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ডযোগ্য, তাহলে নির্দিষ্ট শর্তে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা যেতে পারে। অর্থাৎ শুধু অভিযোগ থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউকে ফেরত পাঠাতে হবে এমন নয়। চুক্তির অন্যান্য শর্তও বিবেচনা করতে হবে।

শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে পলিটিক্যাল অফেন্স এক্সেপশন, অর্থাৎ রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো অপরাধকে রাজনৈতিক চরিত্রের বলে বিবেচনা করা হলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। কিন্তু একই অনুচ্ছেদে বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, হত্যাকাণ্ড, গুরুতর শারীরিক ক্ষতি, অপহরণ, জিম্মি করা এবং নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী অপরাধ রয়েছে।

এখানেই হাসিনার মামলাটি জটিল হয়ে যায়। বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগে বিচার ও সাজা হয়েছে, তার মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যাকাণ্ড এবং বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের মতো অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। বাংলাদেশ বলছে, এটি রাজনৈতিক মামলা নয়, গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার। অন্যদিকে হাসিনা এই বিচারকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো অন্যায় বা নিপীড়নমূলক হবে বলে যদি তিনি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে পারেন, কিংবা অভিযোগটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে সৎভাবে করা হয়নি বলে মনে হয়, তাহলে প্রত্যর্পণ না করার সুযোগ রয়েছে। একই ধারায় আগের খালাস বা দণ্ডের মতো আইনি বিষয়ও বিবেচনার কথা রয়েছে।

ভারতের নিজস্ব এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট, ১৯৬২-তেও প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কোনো অপরাধ রাজনৈতিক চরিত্রের হলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। আবার কোনো ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের অনুরোধের ভিত্তিতে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ে তদন্ত বা অনুসন্ধানের পর কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। ২০১৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তিতে সংশোধন আনে। ওই সংশোধনের ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফেরত চাওয়ার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ করা হয়। বিভিন্ন আইনি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ অনুরোধের সঙ্গে আদালতের বৈধ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকাই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং আগের মতো বিস্তারিত প্রমাণের বোঝা কমানো হয়।

তবে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম আইনি প্রশ্ন রয়েছে। তিনি এখন শুধু অভিযুক্ত নন, বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিতও হয়েছেন। ফলে প্রত্যর্পণ অনুরোধের ক্ষেত্রে তাঁর কনভিকশন, সাজা এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। চুক্তির ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আলাদা নথিপত্রের কথা বলা হয়েছে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। বাংলাদেশের আদালত হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ভারত যদি তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে সেই সাজা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠতে পারে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। অনেক আলোচনায় ইউএন মডেল অ্যান্ড এক্সট্রাডিশনকে এমন একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা ভারতকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। বাস্তবে এটি একটি মডেল আইন, অর্থাৎ দেশগুলোকে প্রত্যর্পণ আইন তৈরির ক্ষেত্রে দিকনির্দেশ দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের তৈরি নমুনা কাঠামো। এটি নিজে কোনো বাধ্যতামূলক দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মতো নয়। তাই হাসিনার ক্ষেত্রে মূল আইনি ভিত্তি হবে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি, ভারতের অভ্যন্তরীণ আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়া।

মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি অবশ্য ভারতের প্রত্যর্পণ নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনো দেশে এমন অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলে এবং ভারতের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড না থাকলে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার নিশ্চয়তা চাওয়া হতে পারে।

তবে হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। কারণ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। ভারত যদি প্রত্যর্পণের কথা বিবেচনা করে, তাহলে শুধু তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানো হবে কি না তা নয়, তাঁর বিচারপ্রক্রিয়া, আপিলের সুযোগ, মৃত্যুদণ্ড এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

এদিকে ভারতের অবস্থান এখন পর্যন্ত খুব সতর্ক। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অধীনে পরীক্ষা করা হচ্ছে। জুলাই ২০২৬-এ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

জুলাইয়ের শেষ দিকে ভারতের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটিও হাসিনার প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়টি নোট করে। ভারত সরকার কমিটিকে জানিয়েছে, অনুরোধটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রযোজ্য আইন ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে ঢাকার পক্ষ থেকে বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে ঢাকার পক্ষ থেকে একটি অনুকূল বা প্রপিশিয়াস এনভায়রনমেন্ট তৈরির কথা বলা হয়েছে এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের জবাব চাওয়া হয়েছে।

ফলে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নটি এখন শুধু আদালত বা চুক্তির বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এখানে একই সঙ্গে কাজ করছে আইন, কূটনীতি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা।

আইনগতভাবে ভারতের সামনে একটি সরল পথ নেই। বাংলাদেশ বলছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের বিচার হয়েছে এবং সেসব অপরাধ রাজনৈতিক অপরাধের ব্যতিক্রমের আওতায় পড়ে না। অন্যদিকে ভারতের হাতে চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদসহ কিছু আইনি বিবেচনার সুযোগ রয়েছে, বিশেষ করে অভিযোগের গুড ফেইথ, ন্যায়বিচার এবং প্রত্যর্পণ করলে সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তি থাকা মানেই প্রত্যর্পণ স্বয়ংক্রিয় নয়, আবার রাজনৈতিক চরিত্রের যুক্তি থাকলেই ভারত সহজে প্রত্যর্পণ আটকে দিতে পারবে এমনও নয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অনুরোধের আইনি ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট নথি, হাসিনার বিরুদ্ধে দণ্ড, বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা এবং প্রত্যর্পণের পর তাঁর অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

এই কারণেই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি। দিল্লি শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের গতিপথেও তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।