বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার আলোচনার কেন্দ্রে রাষ্ট্রপতির চেয়ার। গত ২৪ জুলাই ২০২৬ পদত্যাগ করেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন শেখ হাসিনার আমলে। পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে, মনোনয়নপত্র দাখিল ১৩ আগস্ট, বাছাই ১৬ আগস্ট, প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট, আর ভোটগ্রহণ ২০ আগস্ট।
এই নির্বাচন এমন একসময় হচ্ছে, যখন দেশ সবেমাত্র একটি বড় রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দীর্ঘ অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ঠিক তার আগে, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে বহুল আলোচিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দেয় জনগণ, যার মধ্যে ছিল রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও।
এই প্রেক্ষাপটেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রপতি পদটি আসলে কতটা ক্ষমতাধর? সংস্কারের ফলে সামনে কী বদলাচ্ছে? আর নতুন যিনি রাষ্ট্রপতি হবেন, তাঁর কাঁধে কী দায়িত্ব এসে পড়বে?
সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা
বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁর সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য। অর্থাৎ, ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে যে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, রাষ্ট্রপতি মূলত রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান, রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও ধারাবাহিকতার প্রতীক।
তবে কাগজে-কলমে রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাও থেকে যায়:
জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ (এটি একমাত্র ক্ষেত্র, যেখানে তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব বিচক্ষণতা কাজ করার কথা, বিশেষত সংসদে কোনো দলের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে)
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া বা অধিবেশন আহ্বান-স্থগিত করা।
প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারক নিয়োগ।
সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতিদান (রাষ্ট্রপতির হাতে সীমিত সময়ের জন্য বিল ফেরত পাঠানোর ক্ষমতা থাকলেও চূড়ান্তভাবে তা আটকে রাখার ক্ষমতা নেই)।
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কত্ব (মূলত আনুষ্ঠানিক, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে)।
ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা (রাষ্ট্রপতির ক্ষমা-সংক্রান্ত ৪৯ অনুচ্ছেদ, যা নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি অতীতে)।
জরুরি অবস্থা ঘোষণা (তা-ও প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে)।
মোদ্দাকথা, বর্তমান কাঠামোয় রাষ্ট্রপতি অনেকটাই ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের আদলে একজন সাংবিধানিক প্রধান, ক্ষমতা আছে নামে, বাস্তবে প্রয়োগের রাশ প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ সব সময় এমন আনুষ্ঠানিক ছিল না। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অন্তত তিনটি সময়ে রাষ্ট্রপতির হাতে ছিল প্রায় সর্বময় ক্ষমতা।
শেখ মুজিবুর রহমান (বাকশাল আমল, ১৯৭৫): ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, যেখানে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয় নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগের ওপর কার্যত অভূতপূর্ব ক্ষমতা। শেখ মুজিব নিজে তখন রাষ্ট্রপতি হন, আর এই সময়কালে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ।
জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (সামরিক শাসনামল): ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, দুজনেই রাষ্ট্রপতি পদে থেকে কার্যত সংসদ ও বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বে থেকে শাসন পরিচালনা করেন। এরশাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বকাল দুই ভাগে বিভক্ত, প্রথমে সামরিক শাসক হিসেবে, পরে নির্বাচনে জয়ী হয়ে। এই পুরো সময়টায় রাষ্ট্রপতিই ছিলেন রাষ্ট্রের প্রকৃত ও একচ্ছত্র নির্বাহী প্রধান, কোনো কার্যকর প্রধানমন্ত্রী-নির্ভর ভারসাম্য তখন ছিল না।
১৯৯১–পরবর্তী পরিবর্তন: ১৯৯১ সালে গণআন্দোলনের মুখে এরশাদের পতনের পর দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে, রাষ্ট্রপতির একচ্ছত্র ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর হাতে স্থানান্তরিত হয়। তারপর থেকে অদ্যাবধি রাষ্ট্রপতি মূলত আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধানই থেকে গেছেন।
তাই সংক্ষেপে বলা যায়, সাংবিধানিক অর্থে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল বাকশাল আমলের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে, আর বাস্তবে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করেছেন সামরিক-পরবর্তী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
এখন যিনি রাষ্ট্রপতি হবেন, তিনি কি সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন?
সহজ উত্তর, বর্তমান কাঠামোয় না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই না। যত দিন না সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে সংবিধানে যুক্ত হচ্ছে, তত দিন ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ বলবৎ থাকবে অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতির স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কার্যত নেই।
এখানে আরেকটি বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। জাতীয় সংসদে বিএনপির হাতে বর্তমানে ২০০-র বেশি আসন, কার্যত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে, ফলে যিনিই রাষ্ট্রপতি হোন না কেন, তিনি বাস্তবে সেই দলেরই মনোনীত বা গ্রহণযোগ্য কেউ হবেন, যে দল থেকে প্রধানমন্ত্রীও এসেছেন। এতে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কাগজে-কলমে বাড়লেও, যদি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি একই রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধি হন, তাহলে বাস্তবে তা কতটা প্রকৃত ভারসাম্য তৈরি করবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্রপতি কতটা স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করেন, তার ওপর, শুধু সংবিধানের বিধানের ওপর নয়।
সংস্কার প্রস্তাব: রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়িয়ে ভারসাম্য আনার যেসব ধারা
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে ২৫টি রাজনৈতিক দল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ স্বাক্ষর করে, যাতে ছিল ৪৮টির বেশি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দেয়, যার ফলে নতুন সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এই পরিষদে যেকোনো সংস্কার প্রস্তাব পাসের জন্য প্রয়োজন ১৫১ ভোট, আর সেই সংখ্যা বিএনপির একারই আছে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সংক্রান্ত যেসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি: প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ (সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ) এবং একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে (যেমন দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী) থাকার ওপর বিধিনিষেধের প্রস্তাব রয়েছে, যার বিপরীতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কিছু ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হবে।
সাংবিধানিক পদে নিয়োগে কমিটিভিত্তিক ব্যবস্থা: গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে (যেমন নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন) নিয়োগ আর এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে না হয়ে, ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও প্রয়োজনে বিচার বিভাগের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে হবে, যেখানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আরও সক্রিয় হবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমা–সংক্রান্ত বিধানে সংস্কার: অতীতে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা কার্যত সীমাবদ্ধ ছিল বলে সমালোচনা ছিল। সংস্কার প্রস্তাবে এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আনার কথা বলা হয়েছে।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন: জরুরি অবস্থা ঘোষণায় সংসদের অনুমোদন ও নির্দিষ্ট শর্তের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে একতরফাভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ কঠিন হয়।
উচ্চকক্ষ গঠন ও সংবিধান সংশোধনে নতুন বাধা: দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন হবে, এটি পরোক্ষভাবে ভবিষ্যতে যেকোনো এককেন্দ্রিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভবন ঠেকানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্ত।
বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন: সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনার প্রস্তাব আলোচনায় আছে, যেখানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব প্রস্তাবের কয়েকটিতে একাধিক দলের ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) রয়েছে, বিশেষত রাষ্ট্রপতির নির্বাচনপদ্ধতি ও উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনের প্রশ্নে। ফলে চূড়ান্তভাবে কোন প্রস্তাবগুলো অবিকৃত অবস্থায় সংবিধানে যুক্ত হবে, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভোটাভুটির ওপরই তা নির্ভর করছে।
আসন্ন রাষ্ট্রপতির সামনে কী কী দায়িত্ব অপেক্ষা করছে
২০ আগস্ট নির্বাচিত হতে যাওয়া নতুন রাষ্ট্রপতিকে এমন একটি সময়ে দায়িত্ব নিতে হবে, যখন রাষ্ট্র এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর সামনে উল্লেখযোগ্য কিছু দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ থাকবে:
সংবিধান সংশোধনে সম্মতিদান: সংবিধান সংস্কার পরিষদে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো পাস হওয়ার পর সেগুলোতে রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রয়োজন হবে, এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা প্রতীকী হলেও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর।
নতুন সাংবিধানিক নিয়োগ কাঠামো বাস্তবায়ন: নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নতুন কমিটিভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতির সক্রিয় সংশ্লিষ্টতা থাকবে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রতীকী ভূমিকা: ক্ষমতার পালাবদল, বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সংস্কার-বিরোধী রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে জাতীয় ঐক্য ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে।
আগামী সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ভূমিকা: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলে ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায়ও রাষ্ট্রপতির একটি সাংবিধানিক ভূমিকা থাকার কথা।
সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা: সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন দলের (বিশেষত এনসিপি ও বামপন্থী দলগুলোর) মধ্যে থাকা ভিন্নমত ও সম্ভাব্য আন্দোলনের হুঁশিয়ারির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতিকে একজন নিরপেক্ষ সমন্বয়কের ভূমিকায়ও দেখা যেতে পারে, অন্তত প্রতীকী অর্থে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি সত্যিই ফিরছে, নাকি আবার নতুন সংকট?
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একসময় ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি। ১৯৯৬ সালে সাংবিধানিকভাবে প্রবর্তিত এই ব্যবস্থা ২০১১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করে দেয়, যা পরবর্তী বছরগুলোতে একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচনের পথ তৈরি করে বলে সমালোচকদের অভিযোগ।
জুলাই সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গণভোটে এই প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, এবং সাম্প্রতিক সময়ে আইনমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও তারা ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তবে এখানে কয়েকটি জটিলতা এখনো রয়ে গেছে:
সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এখনো অসম্পূর্ণ: তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত বিধান পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সংশোধনী পাস হতে হবে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিলুপ্ত হওয়া পুরোনো তত্ত্বাবধায়ক বিধান হুবহু পুনর্জীবিত করারও সাংবিধানিক জটিলতা রয়েছে, কারণ পুরোনো বিধানে নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচনের কথা উল্লেখ ছিল, যা এখন প্রাসঙ্গিক নয়।
কে হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান, কীভাবে নিয়োগ হবে: এই প্রশ্নে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতভেদ থেকে যাচ্ছে, অতীতে ঠিক এই প্রশ্নেই (সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা নিয়ে) ২০০৬-০৭ সালে দেশ চরম রাজনৈতিক সংকটে পড়েছিল, যার পরিণতিতে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। সেই তেতো অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই নতুন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক ঐকমত্য নিশ্চিত করা জরুরি হবে।
রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন: তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা কাগজে ফিরে এলেও, দলগুলোর মধ্যে বাস্তব রাজনৈতিক আস্থা তৈরি না হলে ভবিষ্যতেও এই ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশেষত যেহেতু অতীতে ঠিক এই ব্যবস্থার আওতাতেই বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাতের নজির রয়েছে।
তাই এককথায় বলা কঠিন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফিরছে বলেই মনে হচ্ছে, তবে তা সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণ ও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, এবং ভবিষ্যতে তা রাজনৈতিক সংকট এড়াতে পারবে কি না, এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনো সময়ের হাতে।
প্রতীকী পদ, তবু কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ প্রায় তিন দশক ধরে মূলত আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী থেকে গেলেও, বর্তমান রূপান্তরকালীন মুহূর্তে এই পদ নিয়ে যে তীব্র রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা অহেতুক নয়। কারণ, রাষ্ট্রপতি এখন শুধু একজন আনুষ্ঠানিক প্রধান নন, তিনি হতে যাচ্ছেন এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের সাক্ষী ও অংশীদার, যেখানে দেশের মৌলিক রাষ্ট্রকাঠামোই নতুন করে লেখা হচ্ছে। সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কিছুটা সম্প্রসারিত হবে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতার ভারসাম্য কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত স্বাধীনতার ওপর, শুধু সংবিধানের পাতায় লেখা শব্দের ওপর নয়।