ভারতের কোনও সংবাদমাধ্যমকে প্রথম টেলিফোনিক সাক্ষাৎকার দিলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দ্য ওয়ালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে তাঁর দেশে ফেরা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, তারেক রহমান, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন তিনি।
ওই সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন শেখ হাসিনা।
দেশে ফিরতে চান কি না – এই প্রশ্নে শেখ হাসিনার বক্তব্য স্পষ্ট। বাংলাদেশকে নিজের দেশ বলে দাবি করে তিনি বলেন, তাঁকে কেন দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না? তবে একই সঙ্গে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, “আমি ফিরলে এয়ারপোর্টেও আমাকে হত্যা করতে পারে।”
শুধু নিজের জীবনের ঝুঁকি নয়, তাঁর দেশে ফেরার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁর কথায়, “প্রত্যেকের জীবনের ঝুঁকি আছে। আমি দেশে ফেরার জন্য নির্দেশনা দিয়ে কাউকে বিপদে ফেলতে চাই না।”
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাক্ষাৎকারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, দেশে জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে। এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে সতর্ক করেছেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশে জঙ্গিবাদীদের উত্থানের খেসারত ভারতকেও দিতে হবে।”
তাঁর বক্তব্য, প্রতিবেশী বাংলাদেশের অস্থিরতা এবং মৌলবাদী শক্তির বিস্তার ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সেই কারণেই দুই দেশের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক বোঝাপড়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গেও নয়াদিল্লির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “ভারত সরকার কী ভেবে বাংলাদেশের নির্বাচন সমর্থন করল, তারেককে ফিরিয়ে আনল, সেটা ভারত সরকারই ভাল বলতে পারবে।”
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে ভারতের অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনার এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তবে তিনি এ-ও বুঝিয়েছেন, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আঞ্চলিক বোঝাপড়া গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের জন্য জরুরি।
তাঁর কথায়, কোনও সামরিক জোটের পরিবর্তে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সাক্ষাৎকারে বিএনপি নেতা তথা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়েও সরব হয়েছেন শেখ হাসিনা। তারেকের ভারত সফর ঘিরে দর কষাকষির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দর কষাকষি আসলে নিজের দেশকেই খাটো করা।”
শেখ হাসিনার অভিযোগ, তারেক রহমান একসময়ে রাজনীতি করবেন না বলে মুচলেকা দিয়ে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন। বিদেশে বসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নিয়েও তিনি তীব্র সমালোচনা করেন।
তাঁর আরও অভিযোগ, লন্ডন থেকে হিংসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন,“তারেক জিয়া লন্ডন থেকে নির্দেশ দেয়, লাশ ফেলো। সরকার পড়ে যাবে।”
আওয়ামী লীগের দায়িত্বে কে?
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে দেবেন, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন তিনি। তাঁর বোন শেখ রেহানার সক্রিয় রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা কার্যত খারিজ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নয়।”
দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর কথায়, “এখন শেখ সেলিম সিনিয়র মোস্ট প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।”
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। দেশের পরিস্থিতি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে কতটা ব্যথিত করছে, তা বোঝাতে তিনি বলেন, “আমার তো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, যখন দেখছি আমার দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।” দেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং তাঁর প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে অন্য কারও জীবন যাতে বিপন্ন না হয়, সেই আশঙ্কাও বারবার উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদল, ভারত সরকারের ভূমিকা, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এবং নিজের নিরাপত্তা, সব মিলিয়ে দ্য ওয়ালকে দেওয়া শেখ হাসিনার এই এক্সক্লুসিভ টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়।