নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়রের জন্য ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে জোহরান মামদানির বিস্ময়কর বিজয় গোটাবিশ্বেই আলোড়ন তুলেছে।
নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়রের জন্য ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে জোহরান মামদানির বিস্ময়কর বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে এক ভূমিধস পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। উগান্ডা-ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই স্টেট অ্যাসেম্বলি সদস্যের বিজয় দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি বাস্তবতাকেই তুলে ধরে: একটি নতুন, শ্রমজীবী অভিবাসী রাজনীতি, যা সংগঠন, সংহতি এবং বৈষম্যের প্রখর সমালোচনার উপর ভিত্তি করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে দৃঢ়ভাবে জায়গা করে নিচ্ছে। মামদানির প্রচারাভিযান ছিল অনেকটাই এরকম — ভাড়ায় লাগাম পরানো, সার্বজনীন শিশুসেবা, গণপরিবহন এবং সবুজ অবকাঠামোর উপর গুরুত্ব — আর এসবই শহরজুড়ে বহু-জাতিগত শ্রমজীবী শ্রেণির সমর্থনকে একত্রিত করেছে। তার জয় কর্পোরেট প্রভাব ও স্থানীয় দুর্নীতির প্রতি এক চপেটাঘাত এবং এমন এক রাজনীতির শক্তিশালী সমর্থন, যা বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচারের সংগ্রামের সঙ্গে অভিবাসীদের গভীর সংযোগ থেকে জন্ম নিয়েছে।
প্রগতিশীল ও ফিলিস্তিনপন্থী রাজনীতিক জোহরান মামদানির এই সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রো-প্যালেস্টাইন আন্দোলনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে তিনি মেয়র প্রার্থী হিসেবে সরকারি মালিকানাধীন গ্রোসারি, বিনামূল্যে গণপরিবহন ও নিয়ন্ত্রিত ভাড়া সহ নানা ব্যতিক্রমী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে ভোটের আগে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর স্পষ্ট ও সাহসী অবস্থান।
এই আন্দোলন শুধু নিউ ইয়র্কে সীমাবদ্ধ নয়। যেমন কংগ্রেসে ইলহান ওমর — যিনি কিনা শরণার্থী ও প্রাক্তন নিরাপত্তা প্রহরী এবং সোমালি অভিবাসীদের কন্যা — এই নতুন বাম রাজনীতির রূপকারদের অন্যতম। তার সঙ্গে রয়েছেন রাশিদা ত্লাইব, কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম এবং একমাত্র ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নারী। ত্লাইব, ওমর এবং মামদানি এমন একটি রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন, যা শুধুমাত্র মার্কিন বৈষম্য দ্বারা নয়, বরং বিশ্ব দক্ষিণের অর্থনৈতিক সংকোচন, দমননীতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পারিবারিক বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা গঠিত।
এটি কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের কল্পনার অভিবাসন নয়।
২০১৯ সালের অক্টোবরে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিনিয়াপলিসে একটি প্রচার সভায় ভাষণ দেন — একটি শহর যেখানে বিশাল সোমালি জনগোষ্ঠী বাস করে এবং যেটি ইলহান ওমর প্রতিনিধিত্ব করেন। চেনা ডানপন্থী ছকে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, অভিবাসী ও শরণার্থীরা আমেরিকাকে ‘বিপন্ন’ করে তুলছে। মূল বক্তব্যটি স্পষ্ট ছিল: এটি ছিল MAGA ভোটারদের জন্য একটি কৌশলগত সংকেত — বিশেষ করে সেই শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত আমেরিকানদের জন্য, যারা আমেরিকার পতনের জন্য অভিবাসনকে দায়ী করে। এই ভাষ্য এখন নিয়মিত হয়ে গেছে — ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়া থেকে হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে অবৈধ এবং অনেক সময় নিষ্ঠুরভাবে বাস্তবায়িত বহিষ্কার। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, তথাকথিত “শিটহোল” দেশগুলি থেকে আগত অভিবাসীরাই অপরাধ, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং জনসেবার অপব্যবহারের জন্য দায়ী। তিনি যা বলেননি, তা হলো — মিনিয়াপলিসের অনেক সোমালি অভিবাসী সহিংসতা থেকে পালিয়ে এসেছেন, যার পেছনে অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিই দায়ী।
তবুও ট্রাম্প আংশিকভাবে ঠিকই বলেছিলেন: অভিবাসী এবং তাদের উত্তরসূরিরা মার্কিন রাজনৈতিক জীবনে পরিবর্তন আনছে — তবে তার কল্পনার ভয়ানক উপায়ে নয়।
আসলে ট্রাম্পের সেই ভাষণের মাত্র এক বছর আগে, মিনিয়াপলিস শহরতলিতে অ্যামাজনের শোষণমূলক শ্রম নীতির বিরুদ্ধে প্রথম ধর্মঘট হয়। প্রধানত সোমালি অভিবাসীদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন এক নতুন জাতীয় শ্রম-আন্দোলনের সূচনা করে। একটি গুদাম থেকে শুরু হয়ে তা অন্যান্য অ্যামাজন স্থাপনা ও শিল্পক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে।
এ কারণেই মামদানির মেয়র প্রাইমারিতে জয় এতটা গুরুত্বপূর্ণ। ওমরের মতো তিনি এমন এক নেতৃত্বের প্রতীক — যার ভিত্তি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী জনসংগঠন, এবং জটিল নীতিকে সহজবোধ্য ভাষায় ন্যায়বিচারের দাবি হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষমতায় নিহিত। তার প্রচারাভিযান ছিল অর্থনৈতিক মর্যাদা, ভাড়াটেদের অধিকার, শিশুসেবা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং ধনীদের উপর কর আরোপের ওপর ভিত্তি করে — যা শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব জীবনঘনিষ্ঠ চাহিদা থেকে উৎসারিত।
শুধুমাত্র আফ্রিকান অভিবাসীদের কথাই ধরা যাক — মামদানি ও ওমরের শিকড় যেখানে — বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ সাব-সাহারান আফ্রিকান অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেন, যা মোট বিদেশি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫ শতাংশ। মিডিয়া প্রায়শই তাদের শিক্ষাগত বা পেশাগত সাফল্য নিয়ে আলোচনা করে — যা সাধারণত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত প্রবাসীদের তুলে ধরা দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু এই বর্ণনা বেশিরভাগের বাস্তবতা আড়াল করে দেয়: কম গড় আয়, অস্থির কাজ, এবং অন্যান্য অভিবাসী গোষ্ঠীর তুলনায় উচ্চতর দারিদ্র্যের হার।
তবুও এই শ্রমজীবী ভিত্তি থেকেই এক নতুন রাজনীতি গড়ে উঠছে — যা ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে শিকড় থেকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
আমি নিজে “আফ্রিকা ইজ আ কান্ট্রি” নামে একটি ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা করে দেড় দশক ধরে অন্বেষণ করেছি যে কীভাবে আফ্রিকানরা উদারপন্থা, কর্তৃত্ববাদ ও সামরিকীকরণের চাপের মাঝেও গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে নতুনভাবে কল্পনা করছে। নাইজেরিয়ার #EndSARS, উগান্ডার Walk to Work, আরব বসন্ত, দক্ষিণ আফ্রিকার Fees Must Fall— এইসব আন্দোলন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এনে দিয়েছে। এই আন্দোলনগুলো বিশ্বব্যাপী ন্যায়সংগ্রামে প্রভাব ফেলেছে — বিশেষত Black Lives Matter আন্দোলনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণভাবে।
অনেক আফ্রিকান অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রতিরোধ-ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত। মামদানি নিউ ইয়র্কের ঋণে জর্জরিত ট্যাক্সিচালকদের সঙ্গে সংগঠন করেছেন। ওমর অফিস পরিষ্কার করেছেন এবং অ্যাসেম্বলি লাইনে কাজ করেছেন। উভয়েই এমন রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনা এবং সংগঠনের মাধ্যমে শক্তি অর্জন করে।
একটি জাতি যা এখনও ট্রাম্প-যুগের বিদেশীবিদ্বেষ ও বৈষম্যের আঘাত থেকে সেরে উঠছে, সেখানে এই নতুন নেতারা এক আশাব্যঞ্জক বিকল্প উপস্থাপন করছেন। তারা ঐক্য গড়ে তুলছেন বিভেদের রেখা পার হয়ে — অভিবাসী ও দেশজ, মুসলিম ও অমুসলিম, আফ্রিকান-আমেরিকান ও নতুন আফ্রিকান অভিবাসীদের মাঝে — এমন এক সংগ্রামের ভিত্তিতে, যা আত্মীকরণ নয়, বরং যৌথ প্রতিবাদের উপর দাঁড়িয়ে।
রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কোরি রবিন সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেন, মামদানি হলেন ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট ঘরানার “খুশির যোদ্ধা”: তীক্ষ্ণ, বাস্তবভিত্তিক এবং বিতর্কে অংশ নিতে সাহসী। যে সত্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো — তিনি মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় — একটি শহর ও জাতিতে, যা বিশ্ব অভিবাসনের দ্বারা রূপান্তরিত হয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে তার উপস্থিতি এক বিশাল তাৎপর্য বহন করে। তিনি এমন এক গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করেন — যাকে রক্ষণশীলরা কল্পনাও করতে পারে না, দমন তো করাই দূরের কথা।
সূত্র: আলজাজিরা