ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফায় দায়িত্ব পালনকালে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে কথিত সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের পর ওই নারীকে দেওয়া বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ইনফান্তিনো যখন উয়েফার মহাসচিব ছিলেন, তখন ওই নারী কর্মীকে চাকরি ছাড়ার সময় ছয় অঙ্কের একটি অর্থ দেওয়া হয়। পাশাপাশি একটি বিজনেস স্কুলে তাঁর এমবিএ পড়ার খরচও বহন করেছিল উয়েফা।
দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ওই নারীকে তারা নাম প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সম্পর্ক চলাকালে তিনি উয়েফায় তুলনামূলক দ্রুত পদোন্নতি পান। প্রশাসনিক পদে কাজ করা ওই নারী পরে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের একটি বেশি বেতনের পদে যান। সূত্রগুলোর দাবি, তাঁর বেতন প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার সুইস ফ্রাঁ করা হয়েছিল, যা তখনকার হিসাবে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার পাউন্ডের সমান।
বিষয়টি নিয়ে উয়েফার তৎকালীন সভাপতি মিশেল প্লাতিনির কাছেও অভিযোগ পৌঁছেছিল বলে দাবি করেছে দ্য টেলিগ্রাফ। একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, প্লাতিনি ইনফান্তিনোকে পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ওই নারীকে অথবা ইনফান্তিনোকে উয়েফা ছাড়তে হবে, এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। পরে ওই নারীই উয়েফা ছেড়ে যান বলে সূত্রগুলোর দাবি।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তাঁর চাকরি ছাড়ার পর পাওয়া সুবিধা নিয়ে। দ্য টেলিগ্রাফের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ওই নারীকে ছয় অঙ্কের একটি ‘ডিপারচার পেমেন্ট’ বা বিদায়কালীন অর্থ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি স্থানীয় একটি বিজনেস স্কুলে এমবিএ করার জন্যও উয়েফা অর্থ দেয়। ওই প্রতিষ্ঠানের এমবিএ কোর্সের বার্ষিক ফি ছিল প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড।
উয়েফা অবশ্য অর্থ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেনি। শুক্রবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চাকরি ছাড়ার সময় অর্থ দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর এমবিএ কোর্সের ফিও পরিশোধ করা হয়েছিল। তবে উয়েফার দাবি, তখনকার প্রচলিত চাকরি ছাড়ার নিয়ম মেনেই এসব করা হয়েছিল। পরে ২০১৬ সালের পর সংস্থাটি তাদের বিধিমালা আরও কঠোর করেছে।
ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো অবশ্য পুরো অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। ফিফার একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইনফান্তিনো এসব অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ অসত্য’ বলে মনে করেন। তাঁর আচরণ নিয়ে উয়েফা বা ফিফার কোনো কর্মী কখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি বলেও দাবি করেছে ফিফা। সংস্থাটির ভাষ্য, কর্মীদের চাকরি ছাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনেই হয়েছে।
এই অভিযোগ সামনে আসার সময়টিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এরই মধ্যে ইনফান্তিনোকে ঘিরে ফিফায় বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বার্থের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে দেওয়ার বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে ফিফাকে সরে আসতে হয়েছে। ওই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে উয়েফা প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় এবং ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারানোর কথাও জানায়।
বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ আয় থেকে বড় অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনাটি নিয়ে ইউরোপীয় ফুটবল মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করা হয়। উয়েফা এরপরও জানায়, শুধু পরিকল্পনা বাতিল করলেই তাদের উদ্বেগের অবসান হচ্ছে না এবং ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে তাদের আস্থার সংকট রয়ে গেছে।
এর মধ্যেই নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশনও ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছে। এ নিয়ে ফিফার প্রেসিডেন্টের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ছে। তবে ফিফার ভেতরে তাঁর প্রতি সমর্থন এখনো রয়েছে এবং ইনফান্তিনো নিজে পদত্যাগের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইনফান্তিনোর সঙ্গে মিশেল প্লাতিনির পুরোনো সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইনফান্তিনো ২০০০ সালে উয়েফায় যোগ দেন এবং দীর্ঘ সময় সংস্থাটিতে কাজ করেন। ২০০৯ সালে তিনি মহাসচিব হন। ২০১৬ সালে প্লাতিনি ফিফা সভাপতির দৌড় থেকে ছিটকে যাওয়ার পর ইনফান্তিনো ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হন।
প্লাতিনির সঙ্গে ইনফান্তিনোর সম্পর্ক অবশ্য বহু বছর ধরেই জটিল। ২০২৬ সালের জুনে প্লাতিনি আবারও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ফ্রান্সে ফৌজদারি অভিযোগ করেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে ফিফা সভাপতির দৌড় থেকে সরিয়ে দিতে ইনফান্তিনোসহ কয়েকজন ভূমিকা রেখেছিলেন। এর আগে একই ধরনের একটি অভিযোগ ২০২১ সালে করা হলেও সেটি গত বছর বন্ধ হয়ে যায়।
তবে বর্তমান অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনটি মূলত একাধিক সূত্র ও সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে করা অনুসন্ধান। কথিত সম্পর্ক, পদোন্নতি এবং ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত ভূমিকা সম্পর্কে যেসব দাবি করা হয়েছে, সেগুলো ইনফান্তিনো অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে উয়েফার অর্থ প্রদান ও এমবিএর খরচ বহনের বিষয়টি স্বীকার করলেও বলেছে, তখনকার নিয়ম অনুযায়ীই তা করা হয়েছিল।
ফলে নতুন এই অভিযোগ শুধু ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না। মূল প্রশ্ন উঠছে উয়েফার অর্থ কীভাবে ব্যবহার হয়েছিল, ক্ষমতাবান কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কর্মক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলতে পেরেছিল এবং ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মানদণ্ড আসলে কতটা কার্যকর।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব যখন বিশ্বকাপের বাণিজ্যিকীকরণ, উয়েফার অনাস্থা এবং ফিফার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে বড় চাপের মুখে, ঠিক তখনই পুরোনো এই অভিযোগ সামনে আসায় তাঁর জন্য পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), দ্য গার্ডিয়ান, লে’কিপ।