ঐক্যেই জাগরণ: গোপালপুরকে এগিয়ে নিতে ঢাকায় বসবাসকারীদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
28 July 2026 4:21 pm
ঢাকায় অবস্থানরত গোপালপুরের বাসিন্দাদের সংগঠন ‘গোপালপুর উন্নয়ন পরিষদের’ আয়োজনে মতবিনিময় সভায় বক্তাদের একাংশ। ছবি: প্রিয়দেশ

ঢাকায় অবস্থানরত গোপালপুরের বাসিন্দাদের সংগঠন ‘গোপালপুর উন্নয়ন পরিষদের’ আয়োজনে মতবিনিময় সভায় বক্তাদের একাংশ। ছবি: প্রিয়দেশ

গোপালপুরে অনেক কিছুই নাই, সবচেয়ে বেশি নাই বোধ হয় গোপালপুরবাসীর ঐক্য।  এটাই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা। দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষদের মধ্যে যে ঐক্য দেখা যায়, সেটির ছিটেফোটাও টাঙ্গাইল তথা গোপালপুরবাসীর মধ্যে নাই।  উন্নয়নের জন্য নানান বিষয়ের পাশাপাশি ঐক্যের প্রয়োজন। নাহয় এলাকার উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া যায় না।

ঢাকায় অবস্থানরত গোপালপুরের বাসিন্দাদের সংগঠন  ‘গোপালপুর উন্নয়ন পরিষদের’ আয়োজনে এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।  সভায় নিজেদের শিকড় গোপালপুরের পাহাড়সমান সমস্যার বাধা ডিঙিয়ে সার্বিক উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে সমাধান বের করার ওপর জোর দেওয়া হয়।  মতবিনিময় সভায় ধারনার চেয়েও বেশি অংশগ্রহণকারীর সমাগম ঘটে।

বক্তব্যে প্রিয়দেশ সম্পাদক লুৎফর রহমান হিমেল বলেন, একটি জনপদের উন্নয়ন কেবল সরকারি বরাদ্দ, সড়ক-সেতু কিংবা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো মানুষের ঐক্য, সম্মিলিত উদ্যোগ এবং নিজ এলাকার প্রতি দায়বদ্ধতা। সেই জায়গাতেই সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলা। দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষের মতো আঞ্চলিক ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে উঠতে না পারায় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গোপালপুর কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে অনেকটাই বঞ্চিত।

ঐক্যের উপলব্ধি থেকেই রাজধানীতে বসবাসরত গোপালপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ‘গোপালপুর উন্নয়ন পরিষদ’-এর উদ্যোগে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের শিকড়ের জনপদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে একটি সমন্বিত উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করা।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেটের খামারবাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রত্যাশার চেয়েও বেশি মানুষের উপস্থিতি ছিল। সভায় সভাপতিত্ব করেন শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তরুণ উদ্যোক্তা শেখ মো. নুর-এ-আলম সিদ্দিকী (নুর) এবং সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন কৃষিবিদ ও প্রকল্প পরিচালক ড. বদরুল হক শাহীন।

সভায় বক্তারা বলেন, প্রায় তিন লাখ মানুষের এই জনপদ প্রায় ১৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি সম্ভাবনাময় উপজেলা। যমুনা নদীবিধৌত উর্বর ভূমি, কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রবাসী জনশক্তি এবং তরুণ জনগোষ্ঠী, সব মিলিয়ে গোপালপুরের সম্ভাবনা বিশাল। অথচ সমন্বিত পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং সামাজিক ঐক্যের অভাবে সেই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটছে না।

আলোচনায় উঠে আসে, গোপালপুরের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। ধান, পাট, ভুট্টা, সবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের পাশাপাশি যমুনা নদীকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা গেলে এই উপজেলা উত্তরাঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে মত দেন বক্তারা।

বক্তারা আরও বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও গোপালপুর পিছিয়ে নয়। যমুনা নদীর বিস্তৃত চরাঞ্চল, নদীকেন্দ্রিক জীবন, সবুজ গ্রামীণ পরিবেশ এবং ঐতিহ্যবাহী হাট-বাজার পর্যটনেরও সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে নদীভিত্তিক পর্যটন, ইকো-ট্যুরিজম এবং গ্রামীণ সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটন বিকাশ করা সম্ভব।

তবে এই সম্ভাবনার বিপরীতে রয়েছে কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ। বক্তাদের মতে, রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক অনৈক্য, মাদক ও জুয়ার বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, বিনিয়োগের অভাব এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন গোপালপুরকে দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রেখেছে। রাস্তা-ঘাট যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্দশার কথা বলে শেষ করা যাবে না। একসময় ইতিবাচক নানা কারণে পরিচিত এই জনপদে এখন প্রায়ই নেতিবাচক খবর জাতীয় গণমাধ্যমে উঠে আসে, যা উদ্বেগের বিষয়।

সভায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সামাজিক উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, উন্নয়নের প্রশ্নে দল, মত, পেশা কিংবা ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, গোপালপুরের স্বার্থই হতে হবে সবার আগে।

সভায় উপস্থিত অনেকেই বলেন, গোপালপুরের উন্নয়নের জন্য একটি স্থায়ী গবেষণাভিত্তিক উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন, যেখানে দেশের ভেতর ও বাইরে অবস্থানরত গোপালপুরের শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, কৃষিবিদ এবং তরুণ প্রজন্ম একসঙ্গে কাজ করবেন। পাশাপাশি শিক্ষাবৃত্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মতো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণেরও প্রস্তাব উঠে আসে।

মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন খোরশেদুজ্জান মন্টু, উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ, গোপালপুর কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মন্টু, প্রিয়দেশ সম্পাদক লুৎফর রহমান হিমেল, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সমাজকর্মীসহ গোপালপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।

সভা শেষে গোপালপুর উন্নয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সকল গোপালপুরবাসীকে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

বক্তারা বলেন, “একটি জনপদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। মানুষ যদি বিভক্ত হয়, উন্নয়নও বিভক্ত হয়ে যায়। আর মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে সম্ভাবনাই হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি। গোপালপুরের উন্নয়নের চাবিকাঠি তাই একটাই, ঐক্য। এরকম মতবিনিময়ে স্থানীয় এমপি ও জনপ্রতিনিধিরেও সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয় যাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন সহজ হয়।”