সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই রাষ্ট্রপতি পদটিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদটি কখনোই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক পদ ছিল না। কখনো এই পদে বসেই স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছে, কখনো রাষ্ট্রপতির হাত ধরেই শাসনব্যবস্থা পাল্টেছে, আবার কখনো সামরিক অভ্যুত্থান, গণঅভ্যুত্থান কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বঙ্গভবন। সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান বলা হলেও, সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় কার্যনির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে বরাবরই বিতর্ক রয়েছে। তবে সংকটের সময় এই পদটিই বারবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের আলোচনা ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি।
সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই রাষ্ট্রপতি পদটিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার পদত্যাগ, সাংবিধানিক দায়মুক্তি, আইনি বিতর্ক এবং রাজনৈতিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে প্রশ্নটি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরা কে কেমন ছিলেন?
স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেছেন ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন, পেশা ও পটভূমির ব্যক্তিত্ব। কেউ হয়েছেন জাতির প্রতিষ্ঠাতা, কেউ মুক্তিযুদ্ধের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান, কেউ বিচারপতি, কেউ সামরিক শাসক, আবার কেউ দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে বঙ্গভবনে গেছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে তাঁকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। পরে ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালু করে তিনি আবারও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। একই বছরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে বন্দি থাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রবাসী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
স্বাধীনতার পর সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং নবীন রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ প্রথমে ভারপ্রাপ্ত, পরে পূর্ণ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর সময়েই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনের দিকে যেতে শুরু করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনকাল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আসেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব ছাড়েন।
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম সরাসরি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ তাঁর শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ দিক। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার প্রথমে ভারপ্রাপ্ত এবং পরে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক চাপের মুখে তাঁর শাসনের সমাপ্তি ঘটে।
বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হলেও কার্যত ক্ষমতা ছিল সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে। ফলে তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বকে অনেকেই আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী বলে মনে করেন।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতির পদে থেকে প্রায় সাত বছর দেশ শাসন করেন। তাঁর আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের সংকোচন এবং রাজনৈতিক দমনপীড়ন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
এরশাদের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে তিনি সর্বমহলে প্রশংসিত হন। পরে তিনি সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি হিসেবেও পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করেন।
আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সংকট এবং সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমের সেনা বিদ্রোহের প্রচেষ্টা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করেন।
একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের একজন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই দলীয় মতবিরোধের কারণে পদত্যাগ করতে হয় তাঁকে।
অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ায় তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেন। তাঁর সময়ের রাজনৈতিক সংকট শেষ পর্যন্ত জরুরি অবস্থা ঘোষণার পথ তৈরি করে।
জিল্লুর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নম্র, সৌম্য ও পরিমিত রাজনৈতিক আচরণ বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মোহাম্মদ আবদুল হামিদ টানা দুই মেয়াদে প্রায় এক দশক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রপতিদের একজন হন। তাঁর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, সহজ সরল ভাষা এবং রসবোধ তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, এই পদে বসা ব্যক্তিদের মূল্যায়ন কেবল তাঁদের সাংবিধানিক দায়িত্ব দিয়ে হয়নি; বরং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জাতীয় সংকটে তাঁদের ভূমিকার ভিত্তিতেই ইতিহাস তাঁদের বিচার করেছে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরের ইতিহাসে বঙ্গভবনের প্রতিটি অধ্যায়ই একেকটি রাজনৈতিক বাঁকবদলের সাক্ষী। কোথাও নেতৃত্বের দৃঢ়তা, কোথাও বিতর্ক, কোথাও আপস, আবার কোথাও নীরব সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য প্রতীক। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে নতুন করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।