হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠে দেশের রাজনীতির মাঠ।
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় জেলা ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহমদ রিংগনকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ মামলায় আরও অজ্ঞাত পরিচয়ের প্রায় ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। বুধবার রাতে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়ি থেকে অনলাইনে মামলাটি করেন হবিগঞ্জ জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তাহের।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, মঙ্গলবার রাতে হবিগঞ্জে কেন্দ্রীয় নেতাদের সফরকে কেন্দ্র করে এনসিপির গাড়িবহরের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা কয়েকটি মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে এবং নেতাকর্মীদের মারধর করে। এতে এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন বলে দলটির দাবি। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
ঘটনার পরদিন বুধবার সকালে এনসিপির নেতারা সদর থানায় মামলা করতে গেলে প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারার কারণে জেলা শহরে প্রবেশের অনুমতি পাননি। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা শেষে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়ি থেকেই অনলাইনে মামলা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। জেলা প্রশাসনের দাবি, একই দিনে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মসূচি থাকায় সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এ কারণেই আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
এই ঘটনার সূত্রপাত হয় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের হবিগঞ্জ সফরকে ঘিরে। দলটির নেতারা সেখানে একটি পথসভা ও গণসংযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে তাদের বহরে হামলার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এনসিপি অভিযোগ করে, রাজনৈতিকভাবে তাদের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে।
হামলার প্রতিবাদে এনসিপি সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। হবিগঞ্জেও বুধবার সমাবেশের কর্মসূচি দেওয়া হয়। একই সময়ে ছাত্রদল ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রশাসনের আশঙ্কা ছিল, উভয় পক্ষ মুখোমুখি হলে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। সে কারণেই জেলা প্রশাসন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল ও জনসমাগম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
তবে ১৪৪ ধারা জারির সিদ্ধান্ত নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এনসিপির নেতাদের অভিযোগ, হামলার শিকার হওয়ার পরও তাদের কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে প্রশাসনের দাবি, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে নয়, সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে জননিরাপত্তার স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে মামলায় ছাত্রদল নেতার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ঘটনার তদন্ত নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন না হলে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হওয়া উচিত। অপরাধী যে দলেরই হোক, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারই আইনের শাসনের ভিত্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বেড়েছে। এ অবস্থায় প্রশাসনের দায়িত্ব যেমন সংঘর্ষ প্রতিরোধ করা, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিশ্চিত করা। অন্যথায় স্থানীয় সংঘাত দ্রুত জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
হবিগঞ্জের এ ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করে হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মিলবে, তার বিরুদ্ধেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।