বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর তথ্য ভবনে একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম।
জুলাই আন্দোলনের পর রাষ্ট্র ও প্রশাসনে যে মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর ভাষায়, গত চার থেকে পাঁচ মাসে বাস্তব চিত্র খুব বেশি বদলায়নি। ঘুষ, দুর্নীতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং উন্নয়ন উদ্যোগে অকারণ বাধা আগের মতোই রয়ে গেছে। কেবল বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকৌশলে পরিবর্তনের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর তথ্য ভবনে একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, “এই চার পাঁচ মাসে কিছুই বদলায়নি। একইভাবে ঘুষখোর ঘুষ খাচ্ছে। ভালো পরিকল্পনা আগের মতোই আটকে দেওয়া হচ্ছে। আমি সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলাম। তারেক রহমান ছাড়া আর কারও মধ্যে পরিবর্তন ঘটেনি। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।”
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানুষের চিন্তা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে না পারলে সেই আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হবে না। তরুণদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন জুলাই আন্দোলনের পর নতুন সরকারের কাছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কার নিয়ে জনমনে প্রত্যাশা তীব্র। আন্দোলনের সময় দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহির অভাব ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়। অনেকের আশা ছিল, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে, সরকারি সেবায় হয়রানি কমবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা আসবে। কিন্তু বিভিন্ন মহল থেকে এখনো ঘুষ, দাপ্তরিক বিলম্ব এবং পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতির অভিযোগ উঠে আসছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার সমাধান কয়েক মাসে সম্ভব নয়। তবে সংস্কারের দৃশ্যমান সূচনা না হলে মানুষের প্রত্যাশা দ্রুত হতাশায় পরিণত হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জনপ্রশাসন বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার। আইন, প্রশাসন এবং জবাবদিহির কাঠামো শক্তিশালী না হলে টেকসই পরিবর্তন আসে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বহুবার উল্লেখ করেছে, দুর্নীতি কমাতে শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকার যথেষ্ট নয়। সরকারি ক্রয়, নিয়োগ, সেবা প্রদান এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতির পুরোনো ধারা নতুন বাস্তবতাতেও বহাল থাকার ঝুঁকি থাকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের বক্তব্য শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার সমালোচনা নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের পর মানুষের যে উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণে বিলম্বের প্রতিফলনও এতে রয়েছে। আন্দোলনের সময় যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি সামনে এসেছিল, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, এখন সেই প্রশ্নই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী মাসগুলোতে প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম, বিচারিক জবাবদিহি এবং সরকারি সেবার মানোন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে জনমনে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা আরও দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।