যন্তর মন্তরে রাতেও নিভেনি প্রতিবাদের আগুন। তাবুর নিচে কেউ বসে স্লোগান দিচ্ছেন, কেউ মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে, কেউ আবার অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
২০ জুলাই দিল্লির আকাশে সূর্য ডুবে গেছে। সংসদ ভবনের আশপাশে দিনের উত্তেজনা অনেকটাই স্তিমিত। কিন্তু যন্তর মন্তরে তখনও নিভেনি প্রতিবাদের আগুন। তাবুর নিচে কেউ বসে স্লোগান দিচ্ছেন, কেউ মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে, কেউ আবার অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। দিনের বেলা সংসদমুখী মিছিল, পুলিশি বাধা, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের ঘটনার পরও বিক্ষোভকারীরা রাত পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান। তাঁদের বক্তব্য, এই আন্দোলন কেবল একটি দাবির জন্য নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের কথা শোনানোর লড়াই।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যন্তর মন্তর শুধু একটি স্থান নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবাদের প্রতীক। কৃষক আন্দোলন, কুস্তিগিরদের ন্যায়বিচারের দাবি, পরিবেশবাদী কর্মসূচি কিংবা আঞ্চলিক রাজনৈতিক আন্দোলন, বহু গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের সাক্ষী এই চত্বর। তাই সাম্প্রতিক বিক্ষোভও কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি ভারতীয় গণতন্ত্রে প্রতিবাদ, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সোমবারের ঘটনায় প্রথমে সংসদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের আটকে দেয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের অভিযোগ, কিছু বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন এবং নিরাপত্তাকর্মীদের দিকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এতে বহু পুলিশ সদস্য আহত হন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, তাঁদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষের এই ভিন্ন বর্ণনা ঘটনাটিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।
সংঘর্ষের পরও জন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি শেষ হয়নি। বরং সন্ধ্যার পর সেখানে নতুন করে লোকসমাগম বাড়তে থাকে। কেউ খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ ওষুধ, কেউ আবার শুধু সংহতি জানাতে এসেছেন। আন্দোলনের নেতারা দাবি করেন, সরকার আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে এবং সেটিকেই তাঁরা আন্দোলনের প্রথম সাফল্য হিসেবে দেখছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক সমাধানের কোনো ঘোষণা আসেনি।
এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি দ্রুত রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। বিরোধী নেতারা বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন তুলেছেন এবং আন্দোলনকারীদের প্রতি আচরণের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক দলও নিজেদের অবস্থান থেকে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট দাবিকে ঘিরে শুরু হওয়া কর্মসূচি ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিচ্ছে।
এদিকে দিল্লি হাইকোর্টে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, যন্তর মন্তরের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি, ভিডিও ধারণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের দাবি, এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন।
ভারতের সংবিধান নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার স্বীকৃতি দিলেও, নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার প্রশ্নে প্রশাসন প্রায়ই বিধিনিষেধ আরোপ করে। এই দুই অবস্থানের সংঘাত নতুন নয়। ২০২৩ সালে নারী কুস্তিগিরদের আন্দোলনও যন্তর মন্তরকে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। তখনও প্রশ্ন উঠেছিল, প্রতিবাদের অধিকার ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সীমারেখা কোথায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যন্তর মন্তরের মতো প্রতীকী স্থানে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন সাধারণত সরকারের ওপর নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ায়। কিন্তু সেই চাপ বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করে সরকার, আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং জনসমর্থনের ধারাবাহিকতার ওপর। তাঁদের মতে, শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিবাদ থামানো গেলেও অসন্তোষের মূল কারণ দূর করা যায় না; শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংলাপই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি করে।
সূর্যাস্তের পরও যন্তর মন্তরে মানুষের উপস্থিতি তাই কেবল একটি প্রতিবাদের ধারাবাহিকতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক পরিসরে নাগরিকের কণ্ঠস্বর কতটা শোনা হচ্ছে, সেই প্রশ্নেরও প্রতীক। দিল্লির রাজনৈতিক কেন্দ্র থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের সেই চত্বরে রাত যত গভীর হয়েছে, আন্দোলনকারীদের বার্তাও তত স্পষ্ট হয়েছে, আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সরে যেতে প্রস্তুত নন।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য প্রিন্ট