ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ধরনায় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা। আজ মঙ্গলবার বিকেলে নয়া দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে। ছবি: রাহুল গান্ধীর ফেসবুক পোস্ট
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরুটা হয়েছিল একটি পরীক্ষা-সংক্রান্ত ক্ষোভ থেকে। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই ক্ষোভ রূপ নিয়েছে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংকটে। জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ, বেকারত্ব নিয়ে তরুণদের হতাশা এবং পুলিশের কঠোর দমন, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। ঘটনাটি শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি মোদি সরকারের তৃতীয় মেয়াদের অন্যতম বড় জনঅসন্তোষের প্রতীক হয়ে উঠছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, দিল্লিতে ছাত্রদের ওপর পুলিশের কঠোর অভিযানের প্রতিবাদে কংগ্রেস নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে পদযাত্রা করেন। রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, সরকার তরুণদের কণ্ঠ দমন করছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে এ ঘটনার জবাব দিতে হবে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, শিক্ষার্থীদের ওপর যে আচরণ করা হয়েছে, তার জবাবদিহি চাইতেই তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে গেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে। পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ক্ষোভ জমছিল অনেক দিন ধরেই। প্রতিবাদকারীদের দাবি, এই অনিয়মে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হতাশা ও মানসিক চাপে একাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যাও করেছে। যদিও এসব ঘটনার সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য রয়েছে, তবে ছাত্রসমাজের ক্ষোভ যে গভীর হয়েছে, তা নিয়ে দ্বিমত নেই।
দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা করতে গেলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বাধা দেয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস এবং ধস্তাধস্তিতে প্রায় ১৮০ জন আহত হওয়ার খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নারী বিক্ষোভকারীদের প্রতিও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ বলছে, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ ঠেকাতেই তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে।
এই আন্দোলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর নেতৃত্ব। শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত ককরোচ আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের বৃহৎ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। তাদের দাবি এখন শুধু প্রশ্নফাঁসের বিচার নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণাদাতা প্রকৌশলী ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশনও এই বিক্ষোভে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার বলছে, পরীক্ষা জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুনঃপরীক্ষাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের দাবি, কয়েকটি গ্রেপ্তার সমস্যার মূল সমাধান নয়; বরং পুরো পরীক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ঘটনাটি এখন আর কেবল ছাত্র আন্দোলন নয়। এটি ভারতের তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘদিনের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বের বৃহত্তম যুব জনসংখ্যার দেশ ভারত প্রতি বছর লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণকে কর্মসংস্থান দিতে হিমশিম খায়। নিয়োগে অনিয়ম, পরীক্ষা বাতিল, প্রশ্নফাঁস এবং দীর্ঘসূত্রতা তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মোদি সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের বর্ণনার বিপরীতে এই আন্দোলন দেখিয়ে দিচ্ছে যে কর্মসংস্থান ও শিক্ষা এখন ভারতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পুলিশের শক্তি প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী। অপরদিকে সরকারপন্থী মহলের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং নিষিদ্ধ এলাকায় জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতেই পারে।
রাহুল গান্ধী এই ঘটনাকে “ভারতের মূল্যবোধের পরিপন্থী” বলে বর্ণনা করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলেছেন। তাঁর ভাষায়, যে রাষ্ট্র নিজের শিক্ষার্থীদের কথা শোনার বদলে লাঠি দিয়ে জবাব দেয়, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে কংগ্রেসসহ বিরোধী জোট এই আন্দোলনকে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক অধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত করার চেষ্টা করছে।
ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন দ্রুত স্তিমিত হয়ে গেলেও এবারের আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য আলাদা। কারণ এটি শুধু রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করছে না; বরং ছাত্র, তরুণ পেশাজীবী, অভিভাবক এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ এতে সম্পৃক্ত হয়েছে। ফলে আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হলে তা সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এটি ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিরোধী রাজনীতির জন্যও একটি নতুন ইস্যু তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং তরুণদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কারণ প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, বেকারত্ব, নিয়োগে অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকট যদি সমাধান না হয়, তাহলে এই আন্দোলন সাময়িকভাবে স্তিমিত হলেও অসন্তোষের আগুন নেভানো কঠিন হবে। ভারতের রাজনীতিতে ছাত্র আন্দোলন বহুবার বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে কি না, তা নির্ভর করছে সরকার সংলাপের পথ বেছে নেয়, নাকি কঠোর অবস্থানেই অটল থাকে, তার ওপর।
সূত্র: এপি, রয়টার্স, ব্লুমবার্গ, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া।