দেশটি কি ধীরে ধীরে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, নাকি শেষ পর্যন্ত বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে কংগ্রেস? ছবি: দ্য প্রিন্ট
ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রভাব দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। তবে এই আধিপত্যের মধ্যেই একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে, দেশটি কি ধীরে ধীরে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, নাকি শেষ পর্যন্ত বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে কংগ্রেস?
দ্য প্রিন্ট–এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শেখর গুপ্ত লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বে বিজেপি শুধু নির্বাচনে জয়লাভ করছে না, একই সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবও ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনছে। তাঁর মতে, এর ফলে ভারতের রাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে জাতীয় পর্যায়ে বিজেপির একমাত্র কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে থাকবে কংগ্রেস।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিজেপি এমন সব রাজ্যেও কংগ্রেসকে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আক্রমণ করে, যেখানে দলটির সাংগঠনিক উপস্থিতি খুবই দুর্বল। অন্ধ্র প্রদেশ, ওডিশা কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যেও মোদীর বক্তব্যে কংগ্রেস ও গান্ধী পরিবারের সমালোচনা নিয়মিত উঠে আসে। লেখকের মতে, এটি প্রমাণ করে বিজেপি এখনো কংগ্রেসকেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে সম্ভাব্য জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে অন্য কাউকে না।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, গত এক দশকে বহু আঞ্চলিক দল ভাঙন, দলত্যাগ বা রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও তারা বিজেপির সঙ্গে জোট করেছে, কোথাও আবার প্রভাব হারিয়েছে। ফলে বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে কংগ্রেসের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে সুযোগ থাকলেই সাফল্য আসবে, এমন নয়। শেখর গুপ্তর মতে, কংগ্রেসকে শুধু বিজেপি-বিরোধিতা করলেই চলবে না। দলটিকে নতুন রাজনৈতিক দর্শন, স্পষ্ট অর্থনৈতিক নীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বিকল্প রূপরেখা তুলে ধরতে হবে। কেবল মোদীর সমালোচনা করে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করে ক্ষমতাসীন দলের বিকল্প হওয়া সম্ভব নয়।
তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভোটের হার ছিল প্রায় ২১ শতাংশ, আর বিজেপির প্রায় ৩৭ শতাংশ। তাঁর যুক্তি, কংগ্রেস যদি আরও কয়েক শতাংশ ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে পারে, তাহলে ভারতের জাতীয় রাজনীতির সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
এই বিশ্লেষণে হাঙ্গেরি ও তুরস্কের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে একাধিক বিরোধী দলের জোট নয়, বরং একটি শক্তিশালী বিরোধী দল ক্ষমতাসীনদের চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হয়েছে। লেখকের মতে, ভারতেও ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যদি কংগ্রেস নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।
এদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিজেপি কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধীকে রাজনৈতিকভাবে আরও চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে বলে বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসকে একঘরে করা এবং আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়ানোর রাজনৈতিক চেষ্টা চলছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশের অভিমত।
অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দলটি সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করছে। সামনের উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, গুজরাটসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করছে।
ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরই নির্ধারণ করবে দেশটির রাজনীতি একদলীয় আধিপত্যের দিকে এগোবে, নাকি বিজেপি ও কংগ্রেসকে ঘিরে আবারও একটি শক্তিশালী দ্বিদলীয় প্রতিযোগিতা গড়ে উঠবে।
সূত্র: দ্য প্রিন্ট, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া।