সোনম ওয়াংচুক: রাষ্ট্রের ব্যাড সিস্টেমের বিরুদ্ধে একক মানুষের লড়াই

প্রিয়দেশ ডেস্ক
17 July 2026 2:31 pm
রাষ্ট্রের ব্যাড সিস্টেম ভাঙার একক লড়াইয়ে অবতীর্ন হয়েছেন পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুক।

রাষ্ট্রের ব্যাড সিস্টেম ভাঙার একক লড়াইয়ে অবতীর্ন হয়েছেন পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুক।

ভারতের পরিচিত পরিবেশকর্মী, শিক্ষাবিদ ও উদ্ভাবক সোনম ওয়াংচুককে অনেকেই চেনেন থ্রি ইডিয়টস চলচ্চিত্রের ‘রাঞ্চো’ চরিত্রের বাস্তব অনুপ্রেরণা হিসেবে। কিন্তু গত কয়েক বছরে তাঁর পরিচয় আরও বড় হয়েছে, তিনি লাদাখের পরিবেশ, সাংবিধানিক অধিকার এবং জবাবদিহির দাবিতে ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনের অন্যতম মুখ।

২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠনের মাধ্যমে লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। কিন্তু এরপর থেকেই লাদাখের অনেক মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পর্যাপ্ত সাংবিধানিক সুরক্ষা পাচ্ছে না।

ওয়াংচুক এই উদ্বেগকে সামনে এনে কয়েকটি প্রধান দাবি তোলেন। এর মধ্যে ছিল—

১. লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষা দেওয়া,

২. স্থানীয়দের ভূমি ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা,

৩. হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশকে নির্বিচার খনি ও শিল্পায়ন থেকে রক্ষা করা,

৪. নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ও প্রশাসনিক জবাবদিহি জোরদার করা।

২০২৪ সালে তিনি জলবায়ু ও পরিচ্ছন্ন লাদাখের দাবিতে দীর্ঘ অনশন শুরু করেন। পরে “দিল্লি চলো” পদযাত্রার সময় দিল্লির সীমান্তে তাঁকে ও তাঁর সমর্থকদের আটক করা হয়।

২০২৫ সালে লাদাখে আন্দোলন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সহিংসতার পর তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক করা হয়। প্রায় ১৭০ দিন আটক থাকার পর ২০২৬ সালের মার্চে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

মুক্তির পরও তিনি আন্দোলন থামাননি। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আবারও অনশনে বসেছেন। তবে এবার তাঁর আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু শুধু লাদাখ নয়; ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, জবাবদিহির সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধেও তিনি সরব হয়েছেন। অনশনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, কিন্তু তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দিল্লি উচ্চ আদালতও প্রশাসনকে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে।

একক ব্যক্তির লড়াই, রাষ্ট্রের বিবেক

ওয়াংচুকের সমর্থকেরা বলছেন, এটি শুধু একজন মানুষের আন্দোলন নয়। এটি এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যেখানে দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাব, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং নাগরিকদের দাবিকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর সব অভিযোগ মেনে নেওয়া হয়নি এবং বিভিন্ন ইস্যুতে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

ওয়াংচুকের অনশন ভারতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী, আইনজীবী এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। চলচ্চিত্র জগতেরও অনেক পরিচিত মুখ তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং সরকারের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাঁর আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমালয়ের পরিবেশ এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনায় এসেছে।

ভারতে অহিংস আন্দোলনের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ ও লবণ সত্যাগ্রহ, জয়প্রকাশ নারায়ণের “সম্পূর্ণ বিপ্লব”, আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী অনশন, কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলন, সবগুলোই রাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ গণপ্রতিরোধের বড় উদাহরণ।

সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনও সেই ধারার অংশ বলেই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। তবে তাঁর আন্দোলনের বিশেষত্ব হলো, এটি একই সঙ্গে পরিবেশ, সাংবিধানিক অধিকার, শিক্ষা সংস্কার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিকে এক সূত্রে এনে প্রশ্ন তুলছে।

ওয়াংচুকের শারিরীক অবস্থার যথেষ্ট অবনতি ঘটেছে। এরমধ্যে নয় কেজি ওজন কমেছে তার। এরপরও তিনি অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর সমর্থকেরা সংসদমুখী কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার দাবি এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ, দুই দিকেই এখন নজর রয়েছে।

সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কতটা রাজনৈতিক বা নীতিগত পরিবর্তন আনবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, তিনি ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন করে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন।

সূত্র: রয়টার্স, দ্য ইকোনোমিক টাইমস, ইন্ডিয়া টুডে ও টাইমস অব ইন্ডিয়া