২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বার্সেলোনার একটি স্টুডিওতে তোলা হয়েছিল একটি সাধারণ ছবি। উদ্দেশ্য ছিল দাতব্য ক্যালেন্ডার। ছবিতে ছিলেন বার্সেলোনার তরুণ ফুটবলার লিওনেল মেসি এবং মাত্র পাঁচ মাসের এক শিশু। সেদিন কেউ ভাবেনি, এই ছবিটি একদিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আলোকচিত্র হয়ে উঠবে।
প্রায় দুই দশক পর সেই শিশুই দাঁড়িয়ে আছেন মেসির বিপরীতে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। একজন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক, অন্যজন স্পেনের নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু স্পেন-আর্জেন্টিনার লড়াই নয়, এটি সময়েরও এক বিরল পুনর্মিলন।
একটি দাতব্য আয়োজন, যা ইতিহাস হয়ে গেল
ছবিটি তোলা হয়েছিল বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন ও কাতালান ক্রীড়া দৈনিক দিয়ারিও স্পোর্ত-এর যৌথ উদ্যোগে। প্রতিবছর ক্লাবের খেলোয়াড়দের সঙ্গে শিশুদের ছবি তুলে একটি ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা হতো। সেই ক্যালেন্ডার বিক্রির অর্থ ইউনিসেফসহ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হতো।
বার্সেলোনার ১২ জন খেলোয়াড়কে বছরের ১২ মাসের প্রতীক হিসেবে একজন করে শিশুর সঙ্গে জুটি করা হয়েছিল। লিওনেল মেসির ভাগ্যে জুটেছিল মাতারো শহরের পাঁচ মাসের একটি শিশু, লামিনে ইয়ামাল।
সেদিনের সেই ছবিটি অন্য অনেক ছবির মতোই হারিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ইতিহাসের পরিকল্পনা বোধ করি ছিল ভিন্ন কিছু।
লাজুক এক তরুণ, অচেনা এক শিশু
ছবিটি তুলেছিলেন আলোকচিত্রী হুয়ান মনফোর্ত। পরে তিনি জানান, এটি ছিল তাঁর তোলা সবচেয়ে কঠিন ছবিগুলোর একটি।
কারণ, মেসি তখনও ক্যারিয়ারের শুরুতে। রোনালদিনিও, জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, স্যামুয়েল ইতো কিংবা কার্লেস পুয়োলদের ভিড়ে তিনি ছিলেন প্রতিশ্রুতিশীল এক তরুণ মাত্র। ক্যামেরার সামনে স্বাচ্ছন্দ্যও ছিল না খুব একটা।
অন্যদিকে, পাঁচ মাসের একটি শিশুকে পানিভর্তি ছোট্ট বাথটাবে রেখে ছবি তোলার মতো স্বাভাবিক মুহূর্ত তৈরি করাও সহজ কাজ ছিল না।
মনফোর্তের ভাষায়, শুরুতে দুজনই অস্বস্তিতে ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়। সেই স্বাভাবিক মুহূর্তই ধরা হয় ক্যামেরায় যা আজ ইতিহাস।
সেই ছবির আরেক নায়ক
এই গল্পে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ইয়ামালের মা শেইলা এবানা।
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাতারো শহর থেকে পাঁচ মাসের কোলের শিশুকে নিয়ে ক্যাম্প ন্যুতে পৌঁছানো, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা এবং পুরো আয়োজন শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকা, সবই করেছিলেন তিনি।
ছবি তোলার পর অন্য পরিবারের মতো ইয়ামালের পরিবারও ছবিটির একটি কপি পেয়েছিল। সেটি বছরের পর বছর পারিবারিক স্মৃতি হিসেবেই সংরক্ষিত ছিল।
তারপর শুরু আরেক গল্প
সাত বছর পর সেই মাতারো থেকেই নিয়মিত ক্যাম্প ন্যুতে যাতায়াত শুরু করে ফুটবলে অনুরাগী লামিনে ইয়ামাল।
২০১৪ সালে তিনি যোগ দেন বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে।
এরপর সবকিছু যেন খুব দ্রুত ঘটে যেতে থাকে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে লা লিগায় অভিষেক।
১৬ বছর বয়সে স্পেন জাতীয় দলে ডাক।
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়।
আর প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসেই ফাইনালে ওঠা।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ইয়ামাল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ ফুটবলারদের একজন হয়ে ওঠেন।
ভাইরাল হওয়ার পর বদলে যায় ছবিটির পরিচয়
২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালে ইয়ামালের বাবা মৌনির নাসরাউই (মনির নাসরাবি) পুরোনো ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।
মুহূর্তেই ছবিটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে যাকে বলে ভাইরাল।
অনেকেই প্রথমবার জানতে পারেন, মেসির কোলে থাকা সেই শিশুটি আসলে লামিনে ইয়ামাল।
আলোকচিত্রী হুয়ান মনফোর্ত নিজেও বিস্মিত হন। তিনি বলেন, হাজার হাজার ছবি তুলেছি, কিন্তু কোনো ছবিই আমার জীবনকে এতটা পরিচিতি এনে দেয়নি।
সময়ের দুই প্রজন্ম, এক মঞ্চ
ফুটবলে প্রজন্ম বদল হয় ধীরে ধীরে। একজন কিংবদন্তির বিদায়ের সঙ্গে আরেকজনের আগমন ঘটে।
মেসি সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা গত দুই দশক বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করেছেন।
ইয়ামাল সেই প্রজন্মের মুখ, যাদের হাতে আগামী এক দশকের বেশি সময়ের ফুটবল।
বিশ্বকাপ ফাইনাল তাই শুধু দুটি দলের লড়াই নয়; এটি দুই যুগের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হওয়া।
ছবির শেষ অধ্যায় লেখা হবে ফাইনালে
২০০৭ সালে ছবিটি তোলার সময় কেউ ভাবেনি, একদিন এই দুই মানুষ বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রতিপক্ষ হবেন।
সেদিনের তরুণ মেসি আজ কিংবদন্তি।
সেদিনের পাঁচ মাসের শিশু আজ স্পেনের সবচেয়ে বড় ভরসা।
ফল যাই হোক, একটি বিষয় নিশ্চিত, বিশ্বকাপের এই ফাইনাল সেই পুরোনো ছবিটিকে নতুন অর্থ দিয়েছে। এখন এটি আর শুধু একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের ছবি নয়; এটি ফুটবল ইতিহাসের এমন এক মুহূর্ত, যেখানে একই ফ্রেমে ধরা পড়েছিল এক কিংবদন্তির রাজসিক বিদায় এবং আরেক সম্ভাব্য কিংবদন্তির সূচনা।