মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধ, নতুন সংকটের মুখে বিশ্ব

প্রিয়দেশ ডেস্ক
30 July 2026 1:19 am
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে ইরাকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে ইরাকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবার ইরাক, জর্ডান, সৌদি আরব, ইয়েমেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিরাপত্তাই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এই সংঘাত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইরাকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে। এই হামলার মাধ্যমে সৌদি আরবও সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে গেল। এর জবাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বাহিনী লোহিত সাগর এবং বাব আল মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার হুমকি দিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর কোনো এক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং পুরো অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর বহুস্তরীয় চরিত্র। এখানে শুধু রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত নয়, বরং বিভিন্ন দেশে সক্রিয় ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। ইরাকের মিলিশিয়া, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বাহিনীকে ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে একটি সংঘাত অন্য দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষায়, মধ্যপ্রাচ্য এমন এক বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে বাব আল মান্দাব প্রণালি ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান করিডর। এই দুটি পথের যেকোনো একটি দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন সংকট দেখা দিতে পারে।

যদিও সাম্প্রতিক কয়েকটি সময়ে যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তবে তা স্থায়ী হয়নি। একদিকে সামরিক অভিযান, অন্যদিকে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিস্থিতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার জন্য কিছু সময় দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও ময়দানে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শুধু সামরিক নয়, কৌশলগত প্রভাব বিস্তারেরও লড়াই। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, সৌদি আরব এবং তাদের মিত্রদের অবস্থান ভবিষ্যতের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণ করতে পারে। তাই প্রত্যেক পক্ষ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে, যা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, খাদ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশসহ তেল আমদানিনির্ভর বহু দেশের অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সংঘাত এখানেই থামবে, নাকি আরও নতুন দেশ এতে জড়িয়ে পড়বে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক সংকট হয়ে থাকবে না, বরং তা বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: এপি, এএফপি, দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, দ্য গার্ডিয়ান।