মস্তিস্কেও মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক!

বিশেষ প্রতিনিধি
29 July 2026 3:36 am
মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র রয়েছে। এটি শুধু পরিবেশে নয়, খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করেছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র রয়েছে। এটি শুধু পরিবেশে নয়, খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করেছে। ছবি: এআই

প্লাস্টিক দূষণ এখন আর শুধু নদী, সমুদ্র কিংবা ডাস্টবিনের সমস্যা নয়। টুথপেস্ট, খাদ্যপন্য বা শাক-সবজি বা ফলমূলের নয়। এটি এখন মানুষের শরীরের ভেতরের সমস্যাও। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, ধমনি, প্লাসেন্টা এমনকি মস্তিষ্কেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এই অতি ক্ষুদ্র কণাগুলোর নামই মাইক্রোপ্লাস্টিক। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা প্রতিদিন না জেনেই খাবার, পানি এবং বাতাসের সঙ্গে এগুলো শরীরে নিচ্ছি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাল, মাছ, সামুদ্রিক লবণ, মধু, চা, দুধ, বোতলজাত পানি, কোমল পানীয়, ফল, শাকসবজি এমনকি শিশুখাদ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশেও নদী, মাছ, কৃষিজমি এবং খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে একের পর এক গবেষণা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা। এর চেয়েও ক্ষুদ্র কণাকে ন্যানোপ্লাস্টিক বলা হয়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ভাষায়, এই কণাগুলো এতটাই ছোট যে সহজেই বাতাস, পানি, মাটি এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এগুলো কি ইচ্ছা করে মেশানো হয়

উত্তরটি এককথায় দেওয়া যায় না।

কিছু ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্যে যোগ করা হতো। বিশেষ করে মুখ ধোয়ার প্রসাধনী, স্ক্রাব, টুথপেস্ট ও কিছু প্রসাধনীতে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক দানা ব্যবহার করা হতো। এগুলোকে প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। বর্তমানে অনেক দেশ এগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করেছে।

কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা অন্য জায়গায়।

বেশির ভাগ মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয় বড় প্লাস্টিক ভেঙে। রোদ, তাপ, ঘর্ষণ, বৃষ্টি, ঢেউ কিংবা সময়ের প্রভাবে প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট, খাবারের মোড়ক, সিনথেটিক কাপড়, গাড়ির টায়ার, রং, মাছ ধরার জালসহ অসংখ্য প্লাস্টিক পণ্য ধীরে ধীরে ভেঙে অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এগুলোই পরে পানি, মাটি ও খাদ্যে মিশে যায়।

খাবারে কীভাবে ঢুকে পড়ে

অনেকেই মনে করেন কারখানায় খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিক মেশানো হয়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।

খাবার উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্যাকেটজাত করার পুরো প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক থেকে ক্ষুদ্র কণা বিচ্ছিন্ন হতে পারে।

নতুন এক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের মোড়ক, বোতল ও পাত্র থেকে প্রতিনিয়ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক খাদ্যে চলে যাচ্ছে। তাপ, আলো, ঢাকনা বারবার খোলা বন্ধ করা এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। গবেষকদের মতে, বিশ্বের খাদ্য প্যাকেজিং থেকেই প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যে প্রবেশ করছে।

অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ইচ্ছাকৃতভাবে মেশানো হয় না। বরং প্লাস্টিকের ক্ষয়, ব্যবহার ও সংস্পর্শের কারণে ধীরে ধীরে খাদ্যে মিশে যায়।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্লাস্টিক দূষণপ্রবণ দেশগুলোর একটি। বিশেষ করে ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা এবং অন্যান্য নদীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দেশের নদী, মাটি, কৃষিজমি, সার, মাছ এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্য এবং নদীপথে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবাহ এর প্রধান কারণ।

মানুষের শরীরে কী ক্ষতি করে

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে কী পরিমাণ ক্ষতি করে তা নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। তবে এগুলোর উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি জানায়, মানুষ খাবার, পানি এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছে। গবেষণায় এগুলো মানুষের ধমনি, ফুসফুস, প্লাসেন্টাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘদিন ধরে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে জমলে প্রদাহ, কোষের ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, প্রজনন সমস্যা, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব বিষয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন বলেও তাঁরা সতর্ক করছেন।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা

শিশু, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘদিন প্লাস্টিক শিল্পে কাজ করা শ্রমিক এবং যাঁরা নিয়মিত প্লাস্টিকে মোড়ানো বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খান, তাঁদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ইকোসিস্টেম বিভাগের পরিচালক সুসান গার্ডনার বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র রয়েছে। এটি শুধু পরিবেশে নয়, খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করেছে। মানবস্বাস্থ্যের ওপর এর পূর্ণ প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে, তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্লাস্টিকের পুরো জীবনচক্র জুড়েই স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। তাই উৎপাদন থেকে ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত সব পর্যায়ে ঝুঁকি কমাতে হবে।

সমাধানের পথ কোথায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধান শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতায় নয়, রাষ্ট্রীয় নীতিতেও।

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, খাদ্য প্যাকেজিংয়ে নিরাপদ বিকল্প ব্যবহার, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণে বিনিয়োগ এবং প্লাস্টিক উৎপাদন কমানোর আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে হবে। এ কারণেই জাতিসংঘের নেতৃত্বে বৈশ্বিক প্লাস্টিক দূষণবিরোধী চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।

বাংলাদেশেও পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতিসংঘ এবং বিমসটেক যৌথভাবে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মাইক্রোপ্লাস্টিক চোখে দেখা যায় না। কিন্তু তার উপস্থিতি এখন আমাদের চারপাশে, এমনকি শরীরের ভেতরেও। এটি কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকট। বিজ্ঞানীরা এখনো সব উত্তর খুঁজে পাননি। তবে একটি বিষয়ে তাঁরা প্রায় একমত। প্লাস্টিক দূষণ যত বাড়বে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকিও তত বাড়বে। আর সেই ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, নিরাপদ বিকল্প গ্রহণ এবং দূষণকে উৎসেই নিয়ন্ত্রণ করা।