আর কত শিক্ষার্থীর প্রাণ যাবে?—যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে নিহত পরীক্ষার্থীর বাবার আকুতি

প্রিয়দেশ ডেস্ক
24 July 2026 1:57 am
যন্তর মন্তরের সামনে বিক্ষোভে সানা শেখ এর বাবা ও মা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন। সানা সম্প্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বন্ধ হলে আত্মহত্যা করেন।

যন্তর মন্তরের সামনে বিক্ষোভে সানা শেখ এর বাবা ও মা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন। সানা সম্প্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বন্ধ হলে আত্মহত্যা করেন।

ভারতের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার চরম বিপর্যয় এবং ধারাবাহিক প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ঝরে যাওয়া তাজা প্রাণগুলোর বিচার ও ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে দিল্লির যন্তর মন্তর। সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ব্যানারে আয়োজিত সংসদ অভিমুখে লং মার্চ ও প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিয়ে শোকস্তব্ধ এক পিতার প্রশ্ন: “আর কত শিক্ষার্থীর প্রাণ ঝরে পড়লে সরকারের টনক নড়বে?” এই আন্দোলন কেবল কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা বা পদের দাবি নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে ভারতের লাখ লাখ হতাশ ও স্বপ্নভাঙ্গা তরুণের বেঁচে থাকার আকুতি।

এই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকী ও হৃদয়বিদারক মুখ হয়ে উঠেছেন কার্গিল যুদ্ধের অভিজ্ঞ সেনানী রাজেশ মল্ল। তার ২৩ বছর বয়সী কন্যা রিয়া কুমারী থাপা দেরাদুনে একজন নিট পরীক্ষার্থী ছিলেন। গত মে মাসে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরবর্তীতে হঠাৎ তা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর চরম মানসিক অবসাদে ভুগে গত ১৬ জুন তার মেয়ে নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন। মেয়ের ছবি বুকে আগলে রেখে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এই পিতা আক্ষেপ করে বলেন, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই মর্মান্তিক মৃত্যুগুলোর পর ন্যূনতম সমবেদনা জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন যে, যতদিন পর্যন্ত বিচার না মিলবে এবং সিস্টেমের এই অরাজকতা না থামবে, ততদিন তিনি তার মৃত মেয়ের কণ্ঠস্বর হয়ে রাজপথে লড়াই চালিয়ে যাবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং পরীক্ষার বাতিলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার জেরে শুধু রিওয়াই একা নন, দেশজুড়ে বহু শিক্ষার্থী চরম মানসিক অবসাদের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। রাজস্থানের সিকার, ঝাড়খণ্ড কিংবা ছত্তিশগড়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বারবার উঠে আসছে তরুণ মেধাবীদের আত্মহত্যার সংবাদ। অথচ যে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে একটি পরিবার নিজেদের সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে সন্তানদের কোচিংয়ের খরচ জোগায়, সেই ব্যবস্থা আজ দুর্নীতি ও প্রশ্ন ফাঁস চক্রের গ্যাঁড়াকলে বন্দি। অভিভাবকরা বলছেন, এটি কেবল কোনো আকস্মিক আত্মহত্যার ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা ও দুর্নীতির কারণে তিলে তিলে তৈরি হওয়া রাষ্ট্রীয় হত্যা।

বিরোধী রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের এই উদাসীনতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলের নেতারা যন্তর মন্তরের সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে বলেছেন যে, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন একটার পর একটা প্রশ্ন ফাঁস ও কেলেঙ্কারির কারণে অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে, তখন সরকার পুলিশি দমনপীড়ন চালিয়ে তাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে চলা এই অনিয়মের কারণে দেশের মেধাবী ও পরিশ্রমী যুবসমাজ আজ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সরকার ও শাসক দলের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে যে, পরীক্ষার স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা জানিয়েছেন যে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে। তা সত্ত্বেও, যন্তর মন্তরের রাজপথে শোকার্ত অভিভাবকদের এই উপস্থিতি এবং তরুণ সমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে, কেবল মৌখিক আশ্বাস দিয়ে এই গভীর আস্থার সংকট দূর করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে দালালচক্র ও দুর্নীতিমুক্ত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ এই ক্ষোভের আগুন যে আরও ছড়িয়ে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।