অস্ট্রেলিয়ায় টাইগারদের অবিশ্বাস্য ইতিহাস

16 August 2026 2:19 pm

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস! 🇧🇩🏏 ছবিতে বাংলাদেশের মুমিনুল হক ও শাদমান ইসলাম উদযাপনে, আর হতাশায় মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার জশ হ্যাজলউড।

অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে এমন একটি দিন দেখল ক্রিকেট বিশ্ব, যা বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে চিরদিন লেখা থাকবে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। তাও আবার চার দিনের মধ্যেই স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। বিশ্ব টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই জয়কে গার্ডিয়ান তাদের ১৪৯ বছরের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে বিব্রতকর পরাজয় হিসেবে বর্ণনা করেছে।

জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে শেষ দিনে প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫৭ রান। অস্ট্রেলিয়া আগের দিনই নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে যায়। লক্ষ্যটা ছোট হলেও বাংলাদেশের জন্য মুহূর্তটির গুরুত্ব ছিল বিশাল। কারণ এই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো টেস্ট জয়ের সামনে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ।

শেষ পর্যন্ত খুব বেশি নাটক হয়নি। জশ হ্যাজলউড দ্রুত তানজিদ হাসানকে শূন্য রানে ফিরিয়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর শাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক ঠান্ডা মাথায় বাকি রান তুলে নেন। মুমিনুলের ব্যাট থেকে আসা বাউন্ডারিতেই ইতিহাস নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশ ৫৭ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে যায় মাত্র এক উইকেট হারিয়ে।

এই জয়ের পেছনে বাংলাদেশের বোলারদের অবদান ছিল সবচেয়ে বড়। প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামিয়ে ৬ উইকেট নেন। ম্যাচে তার মোট শিকার ৯ উইকেট। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য তিনিই ম্যাচসেরার পুরস্কার পান।

মেহেদী হাসান মিরাজও ছিলেন অসাধারণ। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ৬৫ রান করেন। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসিয়ে দেন। পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধটুকুও ভেঙে দেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি স্পিনারও হয়েছেন মিরাজ।

বাংলাদেশের ব্যাটিংয়েও ছিল ইতিহাস। প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে অস্ট্রেলিয়ার ওপর ২২৮ রানের বিশাল লিড নেয় বাংলাদেশ। তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান করেন ১০১ রান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হন তিনি। তার ইনিংসটি বাংলাদেশের বিশাল লিড তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছিল মাত্র ১৯৮ রানে। স্টিভ স্মিথ ৭১ রান করে একাই কিছুটা প্রতিরোধ গড়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের বোলারদের সামনে অস্ট্রেলিয়ার অন্য ব্যাটাররা সেভাবে দাঁড়াতে পারেননি।

দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য ক্যামেরন গ্রিন একাই ম্যাচটিকে কিছুটা দীর্ঘ করেন। চাপের মুখে অসাধারণ ব্যাটিং করে ১০৪ রান করেন তিনি। তার সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফেরানোর শেষ চেষ্টা ছিল। কিন্তু অন্য প্রান্তে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় গ্রিনের লড়াই শেষ পর্যন্ত বিফলে যায়। অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে বাংলাদেশকে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য দিতে পারে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার এই পরাজয়ের গভীরতাও তুলে ধরা হয়েছে। শুধু একটি ম্যাচ হারেনি অস্ট্রেলিয়া, বরং পুরো ম্যাচজুড়েই বাংলাদেশ তাদের চাপে রেখেছে। তৃতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়া ছিল ১৬১ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে, তখনও বাংলাদেশ থেকে ৬৭ রান পিছিয়ে। স্টিভ স্মিথ ও মার্নাস লাবুশেনের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটাররা বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। বাংলাদেশের পেসার হাসান মাহমুদ এবং স্পিনার তাইজুল ইসলাম নিয়মিত চাপ তৈরি করেছেন।

এর আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতিও খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। অস্ট্রেলিয়া সফরের শুরুতে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে বাংলাদেশ মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল। তার আগে জিম্বাবুয়ের কাছেও ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল দলটি। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের এমন আধিপত্য খুব কম মানুষই অনুমান করেছিলেন।

এই কারণেই ডারউইনের জয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় নয়, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় এটি। দুই দল প্রায় ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলছে। এত দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশ এমন জয় পেল, যা এখন সিরিজ জয়ের সম্ভাবনাও তৈরি করে দিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন, তার দল সবদিক থেকেই বাংলাদেশের কাছে পিছিয়ে ছিল। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা পুরো ম্যাচে স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের বোলাররা ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরি করেছেন, আর ব্যাটাররা সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন।

বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর জন্যও এটি বিশেষ একটি মুহূর্ত। প্রস্তুতি ম্যাচের হতাশা, সাম্প্রতিক ব্যর্থতা এবং অস্ট্রেলিয়ার কঠিন কন্ডিশন সবকিছু পেছনে ফেলে দলটি যে মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে, সেটিই হয়তো এই জয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

এই জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এসে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো মানে দীর্ঘদিনের একটি মানসিক বাধাও ভেঙে দেওয়া। বিশেষ করে এমন একটি দলকে হারানো, যারা নিজেদের ঘরের মাঠে বহু বছর ধরে প্রায় অপ্রতিরোধ্য।

এখন বাংলাদেশের সামনে আরও বড় সুযোগ। দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে তারা দ্বিতীয় টেস্টে নামবে সিরিজ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে। আর অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন নিজেদের সামলানোর কঠিন পরীক্ষা। ডারউইনের এই পরাজয় তাদের শুধু সিরিজের হিসাবেই পিছিয়ে দেয়নি, দলটির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

একসময় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট জয়কে কল্পনা বলেই মনে হতো। ডারউইনে সেই কল্পনাই বাস্তব হয়েছে। বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জিতেছে। ইতিহাস গড়েছে টাইগাররা।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, ইএসপিএন, ক্রিকইনফো।