বিশ্বকাপ কি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে?

ক্রীড়া প্রতিবেদক
31 July 2026 7:39 pm
একের পর এক চাপ এসে ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর পড়ছে।

একের পর এক চাপ এসে ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর পড়ছে।

ইনফান্তিনোর ২০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনায় বিশ্ব ফুটবলে তীব্র ঝড় শুরু হয়েছে। তার উপদেষ্টার পদত্যাগে সংকট আরও গভীর হলো।

বিশ্বকাপ কি ধীরে ধীরে ফুটবলপ্রেমীদের হাতছাড়া হয়ে করপোরেট বিনিয়োগকারীদের সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছে? বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সাম্প্রতিক একটি পরিকল্পনা ঘিরে এখন এই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন বাণিজ্যিক কাঠামো গড়ে তুলে বিশ্বকাপসহ ফিফার সবচেয়ে মূল্যবান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বাইরের বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার পরিকল্পনা প্রকাশের পর ফুটবল বিশ্বে নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ইউরোপের ৫৫টি সদস্য দেশ প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল সংস্থাও কড়া আপত্তি জানিয়েছে। এরই মধ্যে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সিনিয়র উপদেষ্টা কার্লোস কলডেরোর পদত্যাগ বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।

বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ফিফা যে বিপুল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, সেটির কাঠামো বদলে দেওয়ার এই পরিকল্পনাকে অনেকেই সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। ফিফার প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামে একটি সহায়ক প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক ও ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। প্রতিষ্ঠানটির ২০ শতাংশ পর্যন্ত অংশ বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ফিফার দাবি, এতে নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে এবং সংগৃহীত অর্থ বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, নিয়ন্ত্রণ যদি ফিফার হাতেই থাকে, তাহলে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা কয়েকশ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবেন কেন? তাদের প্রত্যাশা তো শেষ পর্যন্ত মুনাফাই। সেই মুনাফা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের সম্প্রচার, বিপণন, টিকিট, স্পনসরশিপ এমনকি প্রতিযোগিতার কাঠামোতেও বাণিজ্যিক চাপ তৈরি হতে পারে। এই আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এই বিতর্কের মধ্যেই পদত্যাগ করেছেন ফিফা সভাপতির সিনিয়র উপদেষ্টা কার্লোস কলডেরো। যুক্তরাষ্ট্র সকার ফেডারেশনের সাবেক সহসভাপতি এবং পেশায় সাবেক ব্যাংকার কলডেরো জানিয়েছেন, পরিকল্পনাটি সম্পর্কে জানার পর থেকেই তিনি এর বিরোধিতা করেছেন। তাঁর ভাষায়, যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই ফুটবলের ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখা হচ্ছে। এটি সদস্য দেশগুলোর জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থেরও পরিপন্থী। তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই পরিকল্পনা প্রণয়নে তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না এবং এর সঙ্গে নিজের নাম জড়াতে চান না।

কলডেরোর পদত্যাগকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এটি ফিফার অভ্যন্তরে নীতিগত মতপার্থক্যের প্রকাশ। কারণ, ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ একজন উপদেষ্টা প্রকাশ্যে পরিকল্পনার বিরোধিতা করে দায়িত্ব ছেড়ে দিলে তা সংস্থার অভ্যন্তরীণ আস্থার সংকটেরও ইঙ্গিত দেয়।

সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে ৫৫টি সদস্য দেশ সর্বসম্মতিক্রমে এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। পরে উয়েফা জানায়, পরিকল্পনা প্রত্যাহার না করা হলে ফিফার ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ নিয়েও তারা পুনর্বিবেচনা করবে। পাশাপাশি তারা লিখিত নিশ্চয়তা চেয়েছে, ভবিষ্যতে ফিফা আর কখনো তার প্রতিযোগিতা বা পরিচালন কাঠামো বাইরের মালিকানার জন্য উন্মুক্ত করবে না।

ফিফার এই সংকট কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এখনই কেউ বলতে পারছে না। ছবি: এআই

ফিফার এই সংকট কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এখনই কেউ বলতে পারছে না। ছবি: এআই

শুধু ইউরোপ নয়, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনক্যাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে এএফসি বলেছে, এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সদস্য সংস্থা, মহাদেশীয় কনফেডারেশন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো অর্থবহ আলোচনা হয়নি। এটি ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

ফুটবল অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্কের মূল কারণ অর্থ নয়, মালিকানার দর্শন। বিশ্বকাপ কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিযোগিতা নয়। এটি সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত সম্পদ। ফলে বাইরের বিনিয়োগকারীদের আর্থিক অংশীদার করা মানেই ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রভাব বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়া।

ক্রীড়া ব্যবসা বিশ্লেষক সাইমন চ্যাডউইক বিভিন্ন সময় বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিফা ক্রমেই একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি একটি বাণিজ্যিক করপোরেশনের মতো আচরণ করছে। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ প্রয়োজন হলেও তা ফুটবলের মৌলিক মূল্যবোধের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।

ফিফা এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির দাবি, গণমাধ্যমে পরিকল্পনাটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরের বিনিয়োগকারীদের হাতে নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হচ্ছে না। বরং নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী ফুটবল, যুব ফুটবল এবং উন্নয়নশীল দেশের ফুটবলে আরও বেশি বিনিয়োগ সম্ভব হবে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি উদ্দেশ্য কেবল উন্নয়ন হয়, তাহলে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ছাড়াই এত বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ কেন নেওয়া হলো? কেন পরিকল্পনাটি প্রথমে গোপন পর্যায়ে প্রস্তুত করা হয়েছিল? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো দিতে পারেনি ফিফা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক কেবল একটি আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে নয়। এটি বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ দর্শন নিয়ে। বিশ্বকাপ কি সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত সম্পদ হিসেবেই থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক বিনিয়োগ তহবিল ও করপোরেট স্বার্থের প্রভাবাধীন একটি বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত হবে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। কার্লোস কলডেরোর পদত্যাগ সেই বিতর্ককে আরও স্পষ্ট করেছে।

এখন নজর ফিফার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ, ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার মতো তিনটি শক্তিশালী ফুটবল অঞ্চলের প্রকাশ্য আপত্তির মুখে ইনফান্তিনো তাঁর পরিকল্পনা সংশোধন করবেন, নাকি বিরোধিতা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাবেন, সেটিই আগামী কয়েক সপ্তাহে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, বিবিসি স্পোর্ট, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য অ্যাথলেটিক, স্কাই স্পোর্টস, ইএসপিএন, ফিফা, উয়েফা, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন, কনক্যাকাফ।