‘র’-এর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও সফল অভিযান হিসেবে বিবেচিত হয় ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা।
ছায়াযুদ্ধের কারিগর: ভারতের ‘র’ কীভাবে কাজ করে, আর কেন তারা মোসাদ–সিআইএর সঙ্গে তুলনীয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও ছিল তাদের অংশগ্রহণ
২০২৩ সালের ১৮ জুন, সন্ধ্যা। কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের ছোট্ট শহর সারে। শহরের গুরু নানক শিখ গুরুদুয়ারার পার্কিং লট থেকে সবেমাত্র নিজের পিকআপ ট্রাক নিয়ে বের হচ্ছিলেন এক শিখ নেতা, নাম তার হরদীপ সিং নিজ্জর। বয়স ৪৫, পেশায় প্লাম্বার, আর পরিচয়ে খালিস্তান আন্দোলনের অন্যতম মুখ। ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা দুই বন্দুকধারী তাঁর গাড়িতে কাছ থেকে একের পর এক গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর।
এই একটি হত্যাকাণ্ডটি প্রথম দেখায় মনে হতে পারে সাধারণ কোনো অপরাধমূলক ঘটনা, তিন মাসের মধ্যেই এটি রূপ নেয় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক এক ভূমিকম্পে। ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কানাডার হাউস অব কমন্সে দাঁড়িয়ে বিস্ফোরক এক অভিযোগ তোলেন, কানাডার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ’ পেয়েছে যে, একজন কানাডীয় নাগরিককে হত্যার পেছনে থাকতে পারে ভারত সরকারের এজেন্টরা। মুহূর্তেই কানাডা বহিষ্কার করে ভারতের এক শীর্ষ কূটনীতিককে, যাঁকে শনাক্ত করা হয় কানাডায় নিযুক্ত ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (রিসার্চ এন্ড এনালিসিস উইং)-এর স্টেশন প্রধান হিসেবে। ভারত পাল্টা জবাবে অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে খারিজ করে দেয়, আর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেমে আসে গত কয়েক দশকের সর্বনিম্ন বিন্দুতে।
ঠিক দুই মাসের মাথায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে, আরেকটি বোমা ফাটায় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, নিউইয়র্কে বসবাসরত আরেক শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার জন্য একজন ভাড়াটে খুনি নিয়োগের চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্তাকে, যাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল চেক প্রজাতন্ত্রে। এই মামলায় পরবর্তীতে সরাসরি নাম আসে সাবেক ‘র’ কর্মকর্তা বিকাশ যাদবের, যাঁকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অভিযুক্ত করে এই হত্যাচেষ্টা পরিকল্পনার নির্দেশদাতা হিসেবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিখিল গুপ্তা মার্কিন আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে নেন।
তবে এই পুরো নাটকের সবচেয়ে জটিল মোড় আসে আরও পরে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে কানাডার রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, নিজ্জর হত্যা মামলার সাংগঠনিক অপরাধ তদন্তে এবং দায়ের করা অভিযোগে ভারত সরকারের কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর আগে একটি কানাডীয় কমিশনের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, কোনো ‘বিদেশি রাষ্ট্রের’ সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সংযোগ ‘প্রমাণিত’ হয়নি। অর্থাৎ ট্রুডোর প্রাথমিক অভিযোগ যতটা তীব্র আলোড়ন তুলেছিল, পরবর্তী সরকারি তদন্তে তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি, যদিও একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পান্নুন হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক এক ‘র’ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা আদালতে স্বীকৃতও হয়ে গেছে।
এই দুটি ঘটনা একটি অপ্রমাণিত থেকে যাওয়া অভিযোগ, আরেকটি আদালতে স্বীকৃত ষড়যন্ত্র, একসঙ্গে মিলে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ বা ‘র’-কে ঘিরে যে রহস্য, বিতর্ক আর আন্তর্জাতিক জটিলতা, তার এক ঝলকানি। আর এই সংস্থারই সবচেয়ে শীর্ষ কর্মকর্তা পরাগ জৈন, যিনি এখন অবস্থান করছেন ঢাকায়।

র-এর বর্তমান প্রধান পরাগ জৈন।
পরাগ জৈন কেন এখন ঢাকায়?
২০২৬ সালের ৯ আগস্ট বিকেলে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে চার সদস্যের একটি ভারতীয় প্রতিনিধিদল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন, যিনি একই সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনী ‘স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ’ (এসপিজি)-এরও সচিব। পরদিন, ১০ আগস্ট, তিনি বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামসুল ইসলামের সঙ্গে। জানা গেছে, বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের আমন্ত্রণেই এই সফর হয়েছে, আর কূটনৈতিক সূত্র একে ‘রুটিন সফর’ বলে বর্ণনা করেছে।
তবে সময়টা মোটেও ‘রুটিন’ নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পর দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকা দুই দেশের গোয়েন্দা ও সামরিক যোগাযোগ চ্যানেল সম্প্রতি আবার সচল হতে শুরু করেছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান নয়াদিল্লি সফরে গিয়ে পরাগ জৈনের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, যেখানে দুই পক্ষের মধ্যে একটি বোঝাপড়া হয়েছিল বলে জানা যায়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, কোনো দেশই যেন অন্যের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আশ্রয় না দেয়। পরাগ জৈনের এবারের ঢাকা সফরকে তাই বিশ্লেষকেরা দেখছেন সেই স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ার আরেকটি ধাপ হিসেবে, বিশেষত যখন দুই দেশের সম্পর্কে এখনো নানা স্পর্শকাতর প্রশ্ন, যেমন শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক জঙ্গিবাদ প্রশ্ন, ঝুলে আছে কাটাতারের উপরে।
ভারতের গোয়েন্দা প্রধানের সফরে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগঝে, ঠিক এই ‘র’ কেমন সংস্থা? কীভাবে কাজ করে তারা? আর কেনই বা তাদের তুলনা করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত দুই গোয়েন্দা সংস্থা, ইসরায়েলের মোসাদ ও যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএর সঙ্গে? তাদের বিশ্ব র্যাংকইবা কত নম্বরে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা, বাজেট বা জনবল গোপনীয় একটি বিষয়। যে কারণে ফুটবল র্যাংকিং বা অন্যান্য বিশ্ব র্যাংকিংয়ের মতো সরকারি বা আন্তর্জাতিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বা সর্বজনস্বীকৃত “র্যাংকিং তালিকা” প্রকাশ করা হয় না। তবে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত বিশ্লেষণ বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিংক ট্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মূল্যায়নে সিআইএ (যুক্তরাষ্ট্র), এমএসএস (চীন), এফএসবি (রাশিয়া), এমআই৬ (যুক্তরাজ্য) এবং মোসাদ (ইসরায়েল)-এর পাশাপাশি ভারতের ‘র’ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং) নিয়মিতভাবেই বিশ্বের শীর্ষ ১০টি শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকে। এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় ‘র’-এর ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার কারণে এটিকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কার্যকর সংস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়।
‘র’-এর জন্ম: একটি সামরিক ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া
১৯৬২ সালে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের অপ্রস্তুত সামরিক পরাজয় এবং ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ, এই দুই ঘটনা ভারতীয় নেতৃত্বের সামনে স্পষ্ট করে দেয় যে দেশের বহিঃগোয়েন্দা সক্ষমতা কতটা দুর্বল। তখন পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃগোয়েন্দা উভয় দায়িত্বই পালন করত একটি মাত্র সংস্থা সেটি হল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি)। যুদ্ধকালীন ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আইবি থেকে বহিঃগোয়েন্দা শাখাকে আলাদা করে গঠন করেন নতুন এক সংস্থা, রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং, সংক্ষেপে ‘র’।
সংস্থাটির প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন রামেশ্বর নাথ কাও, যিনি আইবির একজন উপ-পরিচালক ছিলেন এবং ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। মাত্র আড়াইশো প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা আর সামান্য বাজেট নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সংস্থাকে কাও গড়ে তোলেন এমনভাবে, যাতে তা দ্রুতই হয়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি। কাওয়ের সেই প্রাথমিক দলকে ডাকা হতো ‘কাও বয়েজ’ নামে।
গঠনগত দিক থেকে ‘র’-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি কোনো আইনি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা নয়। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নির্বাহী আদেশে, কোনো সংসদীয় আইনের মাধ্যমে নয়। ‘র’ সরাসরি রিপোর্ট করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ কেবিনেট সচিবালয়ের কাছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। এই কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ বা ব্রিটেনের এমআই৬-এর চেয়ে ভিন্ন। সংস্থাটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ‘উইং’ হিসেবে রাখা হয়েছে, যাতে এটি ভারতের তথ্য অধিকার আইনের (রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট) আওতা থেকে বাইরে থাকতে পারে। এমনকি সংসদীয় তদারকিও এই সংস্থার ক্ষেত্রে কার্যকর নয় বললেই চলে, যা নিয়ে ভারতের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতার প্রশ্নে সমালোচনা রয়েছে।
সংস্থাটির প্রকৃত জনবল ও বাজেট আজও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আওতায়। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের একটি পুরোনো হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সালের দিকে ‘র’-এর কর্মী সংখ্যা ছিল আনুমানিক আট থেকে দশ হাজার, বাজেট ছিল প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যদিও বর্তমান প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার কথা। সংস্থাটির অধীনে রয়েছে একটি বিশেষায়িত বিমান পুনর্বিমান শাখা, ‘এভিয়েশন রিসার্চ সেন্টার’ (এআরসি), যা চীন ও পাকিস্তান সীমান্ত এলাকার আকাশপথে নজরদারির দায়িত্ব পালন করে।
ঘরে–বাইরে ‘র’-এর সবচেয়ে আলোচিত অভিযানগুলো
১৯৭১: বাংলাদেশের জন্মে এক গোপন হাত
‘র’-এর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও সফল অভিযান হিসেবে বিবেচিত হয় ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা। প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মাথায় সংস্থাটির ওপর দায়িত্ব পড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গোপন অভিযান পরিচালনার। ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে যখন সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ বলেন সেনাবাহিনী ডিসেম্বরের আগে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে প্রস্তুত নয়, তখন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সাহায্যের জন্য দ্রুত ফিরে যান ‘র’-এর দিকে।
‘র’-এর কর্মকর্তারা তখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা লাখো বাঙালি শরণার্থীর মধ্য থেকে বেছে নেন প্রশিক্ষণের জন্য যোগ্য তরুণদের, আর তাঁদের নিয়ে গড়ে তোলেন মুক্তিবাহিনী নামের গেরিলা বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। একই সঙ্গে সংস্থার কারিগরি শাখা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ ও গতিবিধি নিয়ে যেসব তথ্য সংগ্রহ করে, তা ভারতীয় বিমানবাহিনীকে পাকিস্তানি বাহিনীকে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে এই অভিযানের সমাপ্তি ঘটে, যা ‘র’-কে নিছক একটি তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা থেকে বড় আকারের গোপন সামরিক অভিযান পরিচালনায় সক্ষম একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে।
১৯৭৫: সিকিমের নীরব অন্তর্ভুক্তি
১৯৭৫ সালে হিমালয়ের ছোট্ট রাজ্য সিকিমকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ‘র’। স্থানীয় রাজনৈতিক আন্দোলন ও গণভোট প্রক্রিয়ার নেপথ্যে সংস্থাটির প্রভাব বিস্তারের কৌশল কাজ করেছিল বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, যদিও এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আজও পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।

‘র’-এর ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় ও করুণ এক অধ্যায় জড়িয়ে আছে রবীন্দ্র কৌশিকের নামের সঙ্গে।
রবীন্দ্র কৌশিক: এক দশক ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ‘র’-এর গুপ্তচর
‘র’-এর ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় ও করুণ এক অধ্যায় জড়িয়ে আছে রবীন্দ্র কৌশিকের নামের সঙ্গে। সত্তরের দশকে মাত্র তেইশ বছর বয়সে ‘র’-এ যোগ দেওয়া এই তরুণকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হয় পাকিস্তানে, নতুন পরিচয়ে, নবী আহমেদ শাকির নামে। বছরের পর বছর ধরে সেই পরিচয়েই তিনি পাকিস্তানি সমাজে মিশে যান, এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে হয়ে ওঠেন মেজর পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠিয়ে গেছেন তিনি ভারতে।
কিন্তু ১৯৮৩ সালে তাঁর পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়, তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ কারাবাসের সময় নির্যাতনের শিকার হন তিনি, আর ২০০১ সালে কারাগারেই যক্ষ্মা ও হৃদরোগে মৃত্যু হয় তাঁর। রবীন্দ্র কৌশিকের কাহিনি ‘র’-এর ইতিহাসে গুপ্তচরবৃত্তির সবচেয়ে গভীর ও মানবিক মূল্য পরিশোধের এক দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে গেছে, যা পরবর্তীতে একাধিক বই ও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
কারগিল থেকে বালাকোট, অপারেশন সিন্দুর পর্যন্ত
১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘাতে পাকিস্তানি অনুপ্রবেশ শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলা, উভয় ক্ষেত্রেই ‘র’-এর সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে ভারতীয় সূত্রে দাবি করা হয়। বর্তমান ‘র’ প্রধান পরাগ জৈন নিজেও পরিচিত পাকিস্তান-বিশেষজ্ঞ হিসেবে, আর ২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় পরিচালিত ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, যা তাঁর ‘র’ প্রধান হিসেবে নিয়োগের অন্যতম কারণ হিসেবেও বিবেচিত হয়।
কুলভূষণ যাদব: পাকিস্তানের চোখে ‘র’-এর গুপ্তচর
২০১৬ সালে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ থেকে গ্রেপ্তার হন সাবেক ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তা কুলভূষণ যাদব। পাকিস্তান তাঁকে ‘র’-এর গুপ্তচর হিসেবে অভিযুক্ত করে সামরিক আদালতে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়, অভিযোগ করে যে তিনি বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রমে মদদ দিচ্ছিলেন। ভারত শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, দাবি করছে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল ইরান থেকে। বিষয়টি গড়ায় আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) পর্যন্ত, যেখানে আদালত পাকিস্তানকে যাদবের মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে নির্দেশ দেয়। মামলাটি আজও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অন্যতম উত্তপ্ত অধ্যায় হয়ে আছে।
বিদেশের মাটিতে বিতর্কিত ‘টার্গেটেড কিলিং’-এর অভিযোগ
গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেয়েছে বিদেশের মাটিতে খালিস্তানপন্থী নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনাগুলো, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কানাডার নিজ্জর হত্যাকাণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে পান্নুন হত্যাচেষ্টা মামলা, যা এই লেখার শুরুতেই বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এই দুই ঘটনা একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি প্যাটার্ন, পশ্চিমা দেশগুলোর মাটিতে বসবাসরত শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারত সরকারিভাবে তা অস্বীকার করে এসেছে, এবং প্রতিটি মামলার আইনি ফলাফলও ভিন্ন ভিন্ন।
মোসাদ: বিশ্বের সবচেয়ে ভীতিকর নাম
তুলনার প্রশ্নে সবার আগে আসে ইসরায়েলের ‘মোসাদ’-এর নাম। মোসাদের আনুষ্ঠানিক নাম ‘ইনস্টিটিউট ফর ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অপারেশনস’। ১৯৪৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের সুপারিশে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা সরাসরি রিপোর্ট করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কাছে। বর্তমানে প্রায় সাত হাজার কর্মী আর আনুমানিক ২৭০ থেকে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বার্ষিক বাজেট নিয়ে মোসাদ বিশ্বের সবচেয়ে বড় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি, যার তালিকায় সিআইএর পরই তাদের অবস্থান বলে ধরা হয়।
মোসাদের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে রয়েছে বিশ্বজুড়ে ‘কাটসা’ নামে পরিচিত ফিল্ড অফিসারদের সমন্বয়ে গঠিত ‘সোমেত’ বিভাগ, সংকেত আটকানোর জন্য ‘কেশেত’, এবং সবচেয়ে বেশি আলোচিত ‘সিজারিয়া’ বিভাগ, যার অধীনে রয়েছে বিশেষ হত্যা অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিট ‘কিডন’। মোসাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত অভিযানগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৭৬ সালের অপারেশন এনটেবি, যেখানে উগান্ডায় জিম্মি হওয়া ইসরায়েলি যাত্রীদের উদ্ধারে পরিচালিত হয় এক দুঃসাহসিক অভিযান। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলা পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হওয়ায় মোসাদ ও ইসরায়েলের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যা সংস্থাটির ‘অপ্রতিরোধ্য’ ভাবমূর্তিতে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সিআইএ: বিশ্বজুড়ে নেটওয়ার্ক যার
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজেট, সবচেয়ে বিস্তৃত বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা সক্ষমতার জন্য পরিচিত। স্নায়ুযুদ্ধকালীন গোপন অভিযান থেকে শুরু করে ড্রোন হামলা এবং ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার মতো অভিযান, সিআইএর ইতিহাস বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়া একাধিক ঘটনায় পরিপূর্ণ। ‘র’ ও মোসাদের তুলনায় সিআইএর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, এটি মার্কিন কংগ্রেসের নির্দিষ্ট তদারকি কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য এবং এর কার্যক্রম একটি সংবিধিবদ্ধ আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়, যদিও গোপনীয়তার প্রশ্নে বাস্তবে এই তদারকি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও বিতর্ক কম নেই।
তিন সংস্থার তুলনামূলক চিত্র
তিনটি সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয় জবাবদিহি ও আইনি কাঠামোর প্রশ্নে। সিআইএর একটি সুনির্দিষ্ট সংবিধিবদ্ধ ভিত্তি ও কংগ্রেসীয় তদারকি কাঠামো রয়েছে। মোসাদও ইসরায়েলি আইন ও সংসদীয় গোয়েন্দা কমিটির অধীনে কাজ করে, যদিও তার অভিযানগত বিস্তারিত অত্যন্ত গোপন থাকে। কিন্তু ‘র’-এর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন, কোনো সংবিধিবদ্ধ আইনি চার্টার নেই, সংসদীয় তদারকি কার্যত অনুপস্থিত, আর জনসাধারণের কাছে জবাবদিহির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমও নেই। এই বৈশিষ্ট্য ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশও দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছেন, দাবি করছেন একটি সংবিধিবদ্ধ চার্টার ও ন্যূনতম সংসদীয় তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার।
বাজেট ও জনবলের দিক থেকে সিআইএ স্পষ্টভাবে এগিয়ে, মোসাদ তুলনামূলক ছোট কিন্তু আঞ্চলিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক, আর ‘র’ এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে অত্যন্ত সক্রিয় হলেও বৈশ্বিক নাগালের দিক থেকে এখনো সীমিত। তিনটি সংস্থারই একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো, প্রয়োজনে সীমান্তের বাইরে গিয়ে গোপন অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ও ইচ্ছা, যদিও প্রতিটি সংস্থার কার্যপদ্ধতি ও নৈতিক-আইনি সীমারেখা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে।
ছায়ার ভেতরের ছায়া
পরাগ জৈনের ঢাকা সফর যতটা না একটি সাধারণ কূটনৈতিক সাক্ষাৎ, তার চেয়ে বেশি এটি একটি প্রতীক, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নীরব কিন্তু সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকার প্রতীক। ১৯৬৮ সালে একটি সামরিক ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নেওয়া ‘র’ আজ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি, যার প্রভাব বাংলাদেশের জন্মকাহিনি থেকে শুরু করে হাজার মাইল দূরের নিউইয়র্ক বা কানাডার রাস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত। মোসাদ বা সিআইএর মতোই ‘র’-ও প্রমাণ করেছে, আধুনিক রাষ্ট্রক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র প্রায়ই তৈরি হয় প্রকাশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং তথ্যের অন্ধকার জগতে, যেখানে বিজয়-পরাজয়ের সীমারেখা কখনোই পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে না।