গণভবন থেকে ইতিহাসের পথে: জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর

নিজস্ব প্রতিবেদক
5 August 2026 7:58 pm
জুলাই আন্দোলনে নাসিরদের মতো খেটে খাওয়া মানুষরাও অংশ নিয়েছিল।

জুলাই আন্দোলনে নাসিরদের মতো খেটে খাওয়া মানুষরাও অংশ নিয়েছিল।

এক সময় যে ভবন ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের প্রতীকী স্থাপনায়। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রতিষ্ঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একসময় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত গণভবনকে স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো।

বুধবার সকাল ৯টায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্মৃতি ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে জাদুঘরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই আন্দোলনে আহত যোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা।

ফলক উন্মোচনের পর প্রধানমন্ত্রী তাঁর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে দেখেন। সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আলোকচিত্র, আন্দোলনে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, দলিল, ভিডিও, ব্যক্তিগত স্মারক এবং আন্দোলনের নানা পর্যায়ের তথ্যচিত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে।

ক্ষমতার প্রতীক থেকে জনগণের স্মৃতির ঠিকানা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণভবন দীর্ঘদিন ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর ভবনটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

ক্ষমতার পালাবদলের এক মাসের মাথায়, ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে গণভবনকে গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য জাদুঘরে রূপান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখনই বলা হয়েছিল, ভবনটি কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, বরং গণআন্দোলনের ইতিহাসের অংশ হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হবে।

প্রায় দুই বছরের সংরক্ষণ, নকশা, পুনর্বিন্যাস এবং প্রদর্শনী প্রস্তুতির পর ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল এই জাদুঘর।

কেবল জুলাই নয়, রাষ্ট্রের স্মৃতিও সংরক্ষণ

জাদুঘরটিতে শুধু ২০২৪ সালের আন্দোলনের স্মৃতি নয়, বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক দমনপীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার বিভিন্ন দলিল, আলোকচিত্র ও তথ্যও স্থান পেয়েছে। আন্দোলনের শহীদদের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী, রক্তাক্ত পোশাক, ব্যানার, পোস্টার, ভিডিও ফুটেজ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথিও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভবিষ্যতে গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এখানে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ, ডকুমেন্টেশন সেন্টার এবং গবেষণা লাইব্রেরি গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বার্তা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পদ নয়; এটি বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রামের ইতিহাস।

তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার নিশ্চিত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ইতিহাস সংরক্ষণ মানে প্রতিশোধ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্য জানার সুযোগ করে দেওয়া।

. ইউনূস: পথ হারালে ইতিহাসের কাছে ফিরে আসতে হবে

অনুষ্ঠানে বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, কোনো জাতি তার স্মৃতি হারালে ভবিষ্যৎও হারিয়ে ফেলে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ শুধু একটি সরকারের পতনের জন্য ছিল না; তারা একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

ড. ইউনূস বলেন, এই জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেবে, রাষ্ট্র যখন জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তখন জনগণই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।

দর্শনার্থীদের জন্য যা থাকছে

উদ্বোধনের দিন জাদুঘরটি শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

আজ, ৬ আগস্ট থেকে এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনলাইনে অগ্রিম টিকিট বুকিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

জাদুঘরের উদ্বোধনের দিনে নতুন আলোচনা

জাদুঘরের উদ্বোধনের দিনই নতুন করে আলোচনায় আসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনা।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গণভবন থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে তাঁকে প্রথমে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে একটি সামরিক পরিবহন বিমানে ভারতের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এসব প্রতিবেদনে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব তথ্যের বিষয়ে এখনো সরকার কিংবা সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রকাশিত তথ্যগুলোর একটি অংশ এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে বর্তমান সরকার জানিয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

ইতিহাস সংরক্ষণের নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ নতুন নয়। স্বাধীনতা জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কিংবা বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় তুলে ধরেছে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের বিশেষত্ব হলো, এটি এমন একটি ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা নিজেই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

ইতিহাসবিদদের মতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রকে জনগণের স্মৃতির কেন্দ্রে রূপান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী পরিবর্তন। এটি কেবল স্থাপত্যের পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্র, ক্ষমতা এবং নাগরিকের সম্পর্কের নতুন এক রাজনৈতিক ভাষ্যও বহন করে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর এই জাদুঘরের উদ্বোধন তাই শুধু একটি স্থাপনার যাত্রা নয়; বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।