রাজধানীর ন্যাশনাল মেডিকেলের সামনে আজ সন্ধ্যার পরও ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। ছবি: সংগৃহীত
মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং উত্তেজনার ঘটনায় আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস রাজনীতি। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা এবং ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা ঘিরে সংঘটিত ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ছাত্ররাজনীতির নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা ক্রমেই সংঘাতের দিকে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সামনে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের ধাওয়া পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং উত্তেজনার কারণে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন হয়।
এদিকে আজ বেলা ৩টার দিকে ঢাকা কলেজে সংঘর্ষে জড়ায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। এদিন কলেজ অডিটোরিয়ামের সামনে দুই পক্ষ তুমুল সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে দুপক্ষেরই কয়েকজন আহত হয় বলে দাবি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষে জড়িয়েছে—এমন খবর আসার পরপরই দুপক্ষ মারামারি শুরু করেন। তাতে ২০ জনের মতো আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলেরই ১১ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিলাদ হোসেন।

মঙ্গলবার দুপুরে সংঘর্ষে জড়ায় ঢাকা কলেজের ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।
একই সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির সংঘর্ষের ঘটনার জের ধরে রাজধানীর ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দফা ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থান নেন, যাতে সংঘর্ষ অন্যত্র ছড়িয়ে না পড়ে।
এর আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একই স্থানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করলে সংঘর্ষের আশঙ্কায় ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দর্শনার্থী ও যানবাহন প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। বিকেলে দুই সংগঠন পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল, জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতা কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর থেকেই ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
একদিনে দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সংঘর্ষ বা উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া নিছক কাকতালীয় নয়। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর ক্যাম্পাসে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটি পূরণে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিযোগিতা এখন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতা, জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ এবং ছাত্রসংসদভিত্তিক ক্ষমতার লড়াই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতি যেমন সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছে, তেমনি স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে তা সহিংসতা, আধিপত্য ও প্রাণহানির কারণও হয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান, প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে ছাত্রসমাজই ছিল পরিবর্তনের অগ্রভাগে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনকে গণআন্দোলনে রূপ দেয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের ক্ষেত্রেও ছাত্রজোটগুলোর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছিল নির্ধারক শক্তি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানেও কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এক দফা দাবিতে রূপ নিয়ে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পথ তৈরি করে।
কিন্তু এই গৌরবময় ইতিহাসের পাশাপাশি রয়েছে রক্তাক্ত আরেকটি অধ্যায়। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বহু শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই বিভিন্ন সময়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘর্ষে শিক্ষার্থী নিহত ও শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। অধিকাংশ সংঘর্ষের পেছনে ছিল হল দখল, সংগঠন বিস্তার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ভর্তি বাণিজ্য কিংবা জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বহুবার অস্ত্র উদ্ধার, ককটেল বিস্ফোরণ এবং ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার ঘটনাও ঘটেছে।
স্বাধীনতার আগে ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন; কিন্তু স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে তা দলীয় ক্ষমতার সম্প্রসারণের একটি অংশে পরিণত হয়। দেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময় বলেছেন, ছাত্ররাজনীতি গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা যদি জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে পেশিশক্তি ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল চরিত্র হারায়। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বহুবার বলেছেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, বরং গণতান্ত্রিক ও শিক্ষাকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্র নয়, মতবিনিময় ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্র হিসেবেই গড়ে তুলতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি যথাসময়ে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের মতো ক্যাম্পাসভিত্তিক আধিপত্যের রাজনীতি আবারও ফিরে আসতে পারে। ছাত্রলীগের নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, এনসিপি-সমর্থিত শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে একই ক্যাম্পাসে একাধিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষ অবস্থান, নিয়মিত ছাত্রসংসদ নির্বাচন, কার্যকর সংলাপ এবং সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। অন্যথায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবারও এমন এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে, যেখানে শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সুনাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, ছাত্রসমাজ যেমন পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি, তেমনি সেই শক্তি যদি সংঘাতের পথে পরিচালিত হয়, তার মূল্য দিতে হয় পুরো জাতিকেই।