ছাত্র আন্দোলনে টালমাটাল ভারত

প্রিয়দেশ ডেস্ক
22 July 2026 5:16 pm
ছাত্র আন্দোলন ভিন্ন মাত্রা নিয়েছে ভারতে।

ছাত্র আন্দোলন ভিন্ন মাত্রা নিয়েছে ভারতে।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের একদিন পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে নেমেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাসহ বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা। বিক্ষোভ চলাকালে তাদের আটক করে দিল্লি পুলিশ। পরে আবার ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের।

বিরোধীদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জবাব এড়াতেই সরকার দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপি বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে এ ধরনের কর্মসূচি রাজনৈতিক নাটক ছাড়া আর কিছু নয়।

রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, আগের দিন শিক্ষার্থীদের ওপর যে ‘নির্মমতা’ চালানো হয়েছে, তার জবাব চাইতেই তারা প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনের সামনে গিয়েছিলেন। কংগ্রেসের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সরিয়ে নিচ্ছেন। পরে কয়েকজন বিরোধী নেতা অভিযোগ করেন, তাদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তারকারা। দিনকে দিন আন্দোলন বেগবান হচ্ছে। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে যন্তর মন্তরে হাজারো শিক্ষার্থী অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস এবং বলপ্রয়োগের পরও তারা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন না। আন্দোলনকারীদের মুখে এখন একটাই স্লোগান, “আমরা এখানেই থাকব।” পুলিশের অভিযানে অনেকের শরীরে আঘাতের চিহ্ন, কারও পায়ে জুতা নেই, তবু আন্দোলনের মনোবল ভাঙেনি। বরং সহিংসতার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তাদের প্রতি সহানুভূতি আরও বেড়েছে।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে বিভিন্ন নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে। রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে কয়েক দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন বহু শিক্ষার্থী ও তরুণ। তাদের অন্যতম দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ছাত্রদের এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বিরোধী দলগুলো বিষয়টিকে জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি ছাত্র আন্দোলন নয়; বরং ভারতের তরুণ ভোটারদের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষেরও প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী মোদির অন্যতম শক্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণদের একটি অংশ এখন কর্মসংস্থান, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছে। ফলে বিরোধী দলগুলো এই ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

ঘটনার পর কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমনে সরকার রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে বিজেপির নেতারা পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতেই কংগ্রেস পরিকল্পিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে কর্মসূচি দিয়েছে। বিজেপির দাবি, নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সংরক্ষিত এলাকায় এমন কর্মসূচি গ্রহণযোগ্য নয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ম মেনেই ব্যবস্থা নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ভারতের রাজনীতিতে বিরোধী শিবিরকে নতুন ইস্যু এনে দিয়েছে। বিশেষ করে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করা প্রতীকী দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিরোধীদের আরও আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকারের অবস্থানও বাড়তি আন্তর্জাতিক নজরে এসেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংকটের প্রভাব শুধু দিল্লির রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কর্মসংস্থান, পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা আগামী মাসগুলোতে ভারতের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। সরকার যদি দ্রুত আস্থার সংকট দূর করতে না পারে, তবে ছাত্রদের ক্ষোভ আরও বিস্তৃত সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সূত্র: রয়টার্স, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, ইকোনমিক টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, আল জাজিরা।