বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো প্রযুক্তির কথা উঠলে একসময় পারমাণবিক অস্ত্র, মহাকাশ কর্মসূচি কিংবা ইন্টারনেটের কথা বলা হতো। এখন সেই তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, আগামী কয়েক দশকে কোন দেশ বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে, তার বড় একটি অংশ নির্ধারিত হবে এই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।
বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাশিয়াও সামরিক খাতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ফলে শুরু হয়েছে নতুন ধরনের এক বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, যাকে অনেক বিশ্লেষক শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত লড়াই বলে মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম যুগ ছিল মানুষের শক্তিনির্ভর যুদ্ধ, দ্বিতীয় যুগ ছিল যন্ত্র ও শিল্পবিপ্লবনির্ভর যুদ্ধ। আর এখন বিশ্ব প্রবেশ করছে তৃতীয় যুগে, যেখানে সিদ্ধান্ত নেবে তথ্য, অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু মানুষের ভাষা বোঝা বা ছবি তৈরির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না। সামরিক বাহিনী এটি ব্যবহার করছে নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ, যুদ্ধক্ষেত্র বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় যান এবং বিভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা কমে আসছে, আর প্রযুক্তির ভূমিকা বাড়ছে বহুগুনে।
যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই প্রতিরক্ষা গবেষণায় বিপুল অর্থ ঢালছে। দেশটির সামরিক পরিকল্পনাবিদরা বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে। অন্যদিকে চীনও জাতীয় পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিগতভাবে এমন অবস্থানে পৌঁছানো, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ বা তারও বেশি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কয়েক বছর আগেই বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেতৃত্ব যে দেশ পাবে, ভবিষ্যতে সেই দেশই বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। এরপর থেকেই মস্কো সামরিক খাতে এই প্রযুক্তির উন্নয়নে আরও জোর দেয়।
তবে এই প্রতিযোগিতা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, রাজনৈতিকও। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে যে দেশ বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে, দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারবে এবং উন্নত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে, সে দেশ সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা পাবে।
জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রিত অস্ত্রব্যবস্থা যদি যথাযথ নীতিমালার আওতায় না আসে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত যদি মানুষের পরিবর্তে যন্ত্র নিতে শুরু করে, তাহলে ভুলের দায় কার হবে, সে প্রশ্নের এখনো স্পষ্ট উত্তর নেই।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো ভুয়া তথ্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ছবি, ভিডিও এবং বক্তব্য তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংঘাত, সব ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি ছড়ানোর নতুন করে সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ ইতোমধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ আবার মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে, তেমনি নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং গবেষণায় এই প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটাতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর সুফল কি সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হবে, নাকি কিছু শক্তিধর দেশের হাতেই প্রযুক্তিগত আধিপত্য কেন্দ্রীভূত হবে?
বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতা বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতা আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়। এটি ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। পারমাণবিক অস্ত্র যেমন বিংশ শতাব্দীর রাজনীতিকে বদলে দিয়েছিল, তেমনি একবিংশ শতাব্দীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং যুদ্ধের ধরনকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
প্রযুক্তির এই দৌড়ে কে এগিয়ে থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার নতুন মুদ্রা হয়ে উঠছে।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড, বিবিসি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, ব্লুমবার্গ, দ্য ইকোনমিস্ট, ফরেন অ্যাফেয়ার্স, সিএনএন, আল জাজিরা।