অনেক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের কাছে এই ফাইনালটি আসলে স্পেনের পক্ষে সমর্থন জোগানোর লড়াই ছিল না; এটি ছিল আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার লড়াই। ছবি: রয়টার্স
খেলার মাঠে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষ কেবল স্কোরবোর্ড দেখে না। তারা দেখে মূল্যবোধ, দেখে কে কোন ইস্যুতে কথা বলছে আর কে চুপ থাকছে। আর খেয়াল করে, সেই নীরবতাগুলো আসলে কীসের বার্তা দিচ্ছে। পুরো বিশ্বকাপজুড়ে আমার মাথায়ও এই বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছিল।
কাগজ-কলমে রোববারের স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনাল ম্যাচটি খুব সাধারণ এক লড়াই মনে হতে পারত। ফুটবল বিশ্বের দুই পরাশক্তি এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের দুটি দেশ। অতীতে যাদের উপনিবেশবাদ ও নিপীড়নের কালো অধ্যায় রয়েছে, যে ইতিহাসগুলোকে শুধু কেউ একটা গোল করতে পারে বলেই ধামাচাপা দেওয়া যায় না। তাই এটি কোনো ভালো বনাম মন্দের রূপকথার লড়াই ছিল না। স্পেনের ঔপনিবেশিক ইতিহাসও সুবিদিত, ইতিহাস জানা থাকলে কেউ তা অস্বীকার করবে না। তবুও অনেক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের কাছে এই ফাইনালটি আসলে স্পেনের পক্ষে সমর্থন জোগানোর লড়াই ছিল না; এটি ছিল আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার লড়াই।
আমার জানামতে, পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে লিওনেল মেসি একবারও তার ভক্তদের দ্বারা ঘটিত বর্ণবাদী আচরণের প্রকাশ্যে নিন্দা জানাননি। কোপা আমেরিকার পর বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় তোলা সেই বর্ণবাদী স্লোগান নিয়েও তিনি প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেননি। এমনকি আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের বর্ণবাদের শিকার হওয়ার ভিডিওগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পরও তিনি মুখ খোলেননি।
ডাক্তার মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তার বিখ্যাত ‘বিয়েন্দ ভিয়েতনাম’ ভাষণে যেমনটি বলেছিলেন: “এমন একটা সময় আসে যখন নীরবতা মানেই বিশ্বাসঘাতকতা।” কখনো কখনো নীরবতা নিজেই একটা জোরালো বিবৃতিতে পরিণত হয়, বিশেষ করে যখন ঘরের সবচেয়ে প্রভাবশালী কণ্ঠটি ইচ্ছাকৃতভাবে চুপ থাকে।
এর বিপরীতে যদি তরুণ প্রজন্মের দিকে তাকাই, তবে অন্য এক চিত্র দেখা যায়। লামিন ইয়ামাল তার পরিবারের ত্যাগ ও সংগ্রাম নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। স্পেনের এই বিজয় কেবল কোনো কৌশল বা বলদখলের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সম্ভাবনার জয়। এই দলটি আধুনিক স্পেনকে ফুটিয়ে তুলেছে, যেখানে রয়েছে বৈচিত্র্য, আত্মবিশ্বাস এবং উন্নত জীবনের আশায় সীমান্ত পেরিয়ে আসা পরিবারগুলোর না বলা গল্প। মাঠে পাসের ফুলঝুরি বা কৌশলগত উদ্ভাবনের চেয়েও এটি ছিল তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা।
রোববার স্পেন আর্জেন্টিনাকে হারানোর পর যে ছবিটি আমার মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে, তা হলো, লামিন ইয়ামাল ও মেসির কোলাকুলি। সেখানে কোনো উপহাস বা বুক ফুলিয়ে অহংকার ছিল না, ছিল এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের প্রতি শ্রদ্ধা। যেমনটা একটি আফ্রিকান প্রবাদে বলা হয়: “সিংহের প্রতিটি শিকারের পর গর্জন করার প্রয়োজন হয় না।” আরেকটি হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য ছিল, ম্যাচের পর মাঠের হট্টগোলের মাঝে ইয়ামালের নিরব প্রার্থনা। চারপাশের সবাই যখন তর্কে লিপ্ত, সে তখন প্রার্থনা করছিল।
এই বিশ্বকাপ কেবল গোলের খেলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, কারণ মানুষ একে তার চেয়েও বড় কিছু হিসেবে দেখেছে। বর্ণবাদ বিষয়টিকে বড় করে তুলেছে, রাজনীতি বড় করে তুলেছে, আর নীরবতা এটিকে আরও তীব্র করেছে। অনেক দর্শকের কাছে স্পেনকে সমর্থন করা মানে স্পেনের ইতিহাসের প্রতি কোনো অন্ধ সমর্থন ছিল না; বরং বর্তমান সময়ে আর্জেন্টিনা যা প্রতিনিধিত্ব করছে, সেটির প্রতিবাদ করা। কখনো নিখুঁত কিছু বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বিকল্পটিকে বেছে নেয়। হয়তো এ কারণেই এত মানুষ এই তরুণ প্রজন্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। শুধু তাদের জেতার জন্য নয়, বরং তারা প্রমাণ করেছে যে ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্ব এবং নৈতিক অবস্থান একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হতে পারে।
লেখক: ইটান থমাস। লেখাটি দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত
ইটান থমাস ২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এনবিএতে খেলেছেন। তিনি একজন লেখক, পডকাস্টার, কবি, সমাজকর্মী এবং প্রেরণাদায়ক বক্তা।