পুত্র যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের দেশের হয়ে ইতিহাস লিখছেন, তখন বাবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে সেই মুহূর্ত দেখছিলেন।
বিশ্বকাপের ফাইনাল। গ্যালারিতে হাজারো দর্শক। স্পেনের রাজা থেকে শুরু করে সাবেক ফুটবলার, তারকা, রাজনীতিক, অনেকেই উপস্থিত। কিন্তু যিনি সবচেয়ে বেশি থাকার কথা ছিল, তিনি ছিলেন না।
তিনি লামিনে ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই।
পুত্র যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের দেশের হয়ে ইতিহাস লিখছেন, তখন বাবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে সেই মুহূর্ত দেখছিলেন। নিরাপত্তা, অসুস্থতা ও পারিবারিক কারণেই তিনি স্টেডিয়ামে যাননি বলে স্প্যানিশ গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের জন্য তাঁর উচ্ছ্বাস আর গর্ব লুকানো যায়নি।
এ যেন শুধু একটি বিশ্বকাপ জয়ের গল্প নয়; এটি একটি পরিবারের, একটি শহরের, একটি অভিবাসী জীবনের এবং এক অসম্ভব স্বপ্নের গল্প।
যে শিশুকে কোলে নিয়েছিলেন মেসি
২০০৭ সালের ডিসেম্বর।
বার্সেলোনার একটি স্টুডিওতে দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য ছবি তোলা হচ্ছিল। ২০ বছরের এক লাজুক ফুটবলারকে ছোট্ট একটি পানিভর্তি বাথটাবের পাশে বসানো হলো। তাঁর কোলে তুলে দেওয়া হলো মাত্র পাঁচ মাসের একটি শিশু।
সেই তরুণ ছিলেন লিওনেল মেসি।
আর শিশুটি লামিনে ইয়ামাল।

২০০৭ সালে ছবিটি তোলার সময় কেউ ভাবেনি, একদিন এই দুই মানুষ বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রতিপক্ষ হবেন।
ছবিটি ছিল একেবারেই সাধারণ। বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন ও কাতালান ক্রীড়া দৈনিক দিয়ারিও স্পোর্ত-এর যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর এমন ক্যালেন্ডার প্রকাশিত হতো। কেউ ভাবেনি, প্রায় দুই দশক পরে এই একটি ছবিই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী আলোকচিত্র হয়ে উঠবে।
যখন ছবিটি আবার আলোচনায় আসে, তখন মেসি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আর তাঁর কোলে থাকা শিশুটি বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত কিশোর ফুটবলার।
ফুটবল যেন একই ফ্রেমে দুই যুগকে ধরে রেখেছিল।
মাতারোর ছোট্ট ছেলেটি
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের শহর মাতারো।
সেখানেই বড় হয়েছেন লামিনে ইয়ামাল। বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কো থেকে স্পেনে এসেছিলেন। মা শেইলা এবানা নিরক্ষীয় গিনি বংশোদ্ভূত।
অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে ইয়ামালের শৈশব ছিল সংগ্রামের। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মায়ের কাছেই বড় হয়েছেন তিনি। কিন্তু দুই পরিবারই তাঁর ফুটবল স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
খুব ছোটবেলা থেকেই বল যেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় খেলনা।
লা মাসিয়া থেকে বিশ্বমঞ্চ

বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের সাথে কোনো এক পুরষ্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে লামিনে ইয়ামাল।
মাত্র সাত বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
১৫ বছর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে অভিষেক। ১৬ বছর বয়সে স্পেন জাতীয় দলে। ১৭ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা। আর ২০২৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
যে বয়সে অনেক ফুটবলার এখনো ক্লাবের যুবদলে জায়গা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করেন, সেই বয়সেই ইয়ামাল ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্রফি হাতে তুলে নিলেন।
স্পেনের নতুন প্রতীক
এই বিশ্বকাপে ইয়ামাল শুধু ড্রিবল করেননি। তিনি ম্যাচের গতি বদলেছেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙেছেন। ফাঁকা জায়গা তৈরি করেছেন।
ফাইনালেও তাঁর উপস্থিতি ছিল স্পেনের আক্রমণের অন্যতম বড় অস্ত্র। অতিরিক্ত সময়ে পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামসের হেডে তৈরি হওয়া বল থেকেই ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোল আসে।
গোলটি তোরেসের নামে।
কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের আক্রমণের প্রাণ ছিলেন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি ও রদ্রি। তাঁদের সমন্বিত ফুটবলই স্পেনকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দেয়।
মেসির উত্তরসূরি?

তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা: মেসির শেষ আর ইয়ামালের শুরু।
ফুটবলে উত্তরসূরি বলে কিছু নেই। পেলে একজনই। মারাদোনা একজনই। মেসিও একজনই। তবু প্রতিটি যুগ নতুন একজন নায়ক খোঁজে।
বিশ্বকাপের আগে অনেকে বলছিলেন, মেসির শেষ নৃত্য। বিশ্বকাপ শেষে আলোচনার কেন্দ্রে একজনই, লামিনে ইয়ামাল। এ যেন সময় নিজেই মশাল বদলে দিল।
ফাইনালের গ্যালারিতে বাবা ছিলেন না। কিন্তু মাঠে ছিল তাঁর স্বপ্ন।
মা শেইলা এবানা বহু বছর আগে যে পাঁচ মাসের শিশুকে নিয়ে ক্যাম্প ন্যুতে গিয়েছিলেন মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে, সেই শিশুই আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছে।
কখনো কখনো একটি ছবি ইতিহাসের চেয়েও বড় হয়ে যায়। ২০০৭ সালে মেসির কোলে থাকা শিশুটির ছবিটি আজ শুধু একটি আলোকচিত্র নয়।
এটি প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে যুক্ত করে রাখা এক অদৃশ্য সেতু। সেদিন মেসি হয়তো জানতেন না, তাঁর কোলে থাকা শিশুটি একদিন বিশ্বকাপের আলো নিজের দিকে টেনে নেবে।
আজ সেই শিশুই বিশ্ব ফুটবলের নতুন মুখ। স্পেনের নতুন আইকন। আর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে বিশ্বকাপের নতুন প্রতীক।