প্রদীপ সিং রাওয়াত: পর্দায় ভয়ংকর বাস্তবে বিনয়ী মানুষ

বিনোদন প্রতিবেদক
5 August 2026 1:23 pm
ক্যামেরার সামনে ভয়ংকর চরিত্রে অভিনয় শেষ করেই প্রদীপ হাসিমুখে সবার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠতেন।

ক্যামেরার সামনে ভয়ংকর চরিত্রে অভিনয় শেষ করেই প্রদীপ হাসিমুখে সবার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠতেন।

একটি দৃশ্য আজও ভারতীয় সিনেমাপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। মাথায় টাক, গায়ে ট্যাটু, চোখে নির্মম দৃষ্টি, ঠান্ডা কণ্ঠে হুমকি। তিনি ‘গজনি’। আমির খান অভিনীত বহুল আলোচিত গজনি ছবির সেই ভয়ংকর খলনায়ক। পর্দায় যাঁর উপস্থিতি নায়ককেও বিপদে ফেলেছিল, বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন সহকর্মীদের কাছে শান্ত, বিনয়ী ও অমায়িক একজন মানুষ। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সেই শক্তিমান অভিনেতা প্রদীপ সিং রাওয়াত আর নেই। রক্তের ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে মঙ্গলবার ৭৪ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি।

অভিনেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর ব্যবস্থাপক সিদ্ধার্থ তিওয়ারি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, কিছুদিন আগে ক্যানসার আবারও ফিরে আসে। এক মাসের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন প্রদীপ রাওয়াত। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টাও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচাতে পারেনি।

প্রদীপ রাওয়াতের মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্রাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সহশিল্পী, নির্মাতা ও চলচ্চিত্রপ্রেমীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মরণ করছেন এমন এক অভিনেতাকে, যিনি নায়ক না হয়েও নিজের অভিনয় দিয়ে কোটি দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন। অভিনেতা যশপাল শর্মা লিখেছেন, গজনি লগানের প্রদীপ রাওয়াত, শান্তিতে ঘুমাও।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে ১৯৫২ সালের ২১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন প্রদীপ সিং রাওয়াত। অভিনয়ের শুরু ছোট পর্দায়। বি আর চোপড়ার কালজয়ী টেলিভিশন ধারাবাহিক মহাভারত-এ অশ্বত্থামার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রথম দর্শকদের নজরে আসেন। সেই চরিত্রই তাঁকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। এরপর ধীরে ধীরে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু হয়।

১৯৮৫ সালে এতবার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হলেও নব্বইয়ের দশকেই তিনি বলিউডের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খলনায়ক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। অগ্নিপথ, কয়লা, সরফরোশ, মেজর সাবসহ একের পর এক ছবিতে তাঁর বলিষ্ঠ উপস্থিতি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০০১ সালে লগান ছবিতে দেবা সিং সোধি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। সেই ছবিতে আমির খানের বিপরীতে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।

এরপর আসে গজনি। ২০০৫ সালে সূরিয়া অভিনীত তামিল সংস্করণে এবং ২০০৮ সালে আমির খান অভিনীত হিন্দি সংস্করণে একই চরিত্রে অভিনয় করেন প্রদীপ রাওয়াত। ‘গজনি ধর্মাত্মা’ চরিত্রটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় খলচরিত্রে পরিণত হয়। ভয়ংকর চাহনি, গভীর কণ্ঠস্বর এবং নির্মম ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি দর্শকদের মনে এমন ছাপ ফেলেছিলেন যে অনেকেই তাঁকে বাস্তব জীবনেও ‘গজনি’ নামেই চিনতেন।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, প্রদীপ রাওয়াত এমন সময়ের অভিনেতা, যখন বলিউডে খলনায়কের চরিত্রগুলো শুধু শক্তিশালী উপস্থিতির ওপর নির্ভর করত না, বরং অভিনয়ের গভীরতা দিয়েও দর্শককে প্রভাবিত করত। অমরিশ পুরী, আশুতোষ রানা, প্রকাশ রাজ কিংবা ড্যানি ডেনজংপার ধারার অভিনেতাদের পরবর্তী প্রজন্মে প্রদীপ রাওয়াত নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছিলেন। তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সংযত অভিব্যক্তি। তিনি উচ্চস্বরে নয়, বরং নীরব ভয় তৈরি করতেন।

শুধু হিন্দি চলচ্চিত্রেই নয়, দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমাতেও ছিল তাঁর সমান জনপ্রিয়তা। তেলেগু চলচ্চিত্র সাই-এ অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ খলনায়ক বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। পরে রাউড়ি রাঠোর, বাঘিসহ অসংখ্য জনপ্রিয় ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা পায়।

চার দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে হিন্দি, তেলেগু, তামিল, নেপালি ও অন্যান্য ভাষার শতাধিক চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন তিনি। তাঁর অভিনয়ের পরিধি শুধু খলনায়কেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করলেও দর্শকের কাছে তিনি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর ভয়ংকর অথচ বিশ্বাসযোগ্য ভিলেন চরিত্রগুলোর জন্য।

বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও প্রদীপ রাওয়াত ছিলেন পরিচিত মুখ। বলিউডের জনপ্রিয় ছবিগুলোর মাধ্যমে তিনি যেমন পরিচিতি পেয়েছেন, তেমনি বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে এসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছেন। অভিনেত্রী ও মডেল লুবাবার সঙ্গে তাঁর একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল।

তাঁর সর্বশেষ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিকি কৌশল অভিনীত ছাবা, তেলেগু চলচ্চিত্র গায়াপাড্ডা সিমহাম এবং নেপালি ছবি বাটা আমা। বয়স ও অসুস্থতা সত্ত্বেও শেষ সময় পর্যন্ত অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

পর্দায় যিনি ছিলেন নির্মম, বাস্তবে তাঁকে সবাই মনে রাখেন ভদ্র, সহৃদয় এবং সহযোগিতাপরায়ণ একজন মানুষ হিসেবে। সহকর্মীরা প্রায়ই বলেছেন, ক্যামেরার সামনে ভয়ংকর চরিত্রে অভিনয় শেষ করেই তিনি হাসিমুখে সবার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠতেন। অভিনয়ই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।

স্ত্রী ও ছেলে বিক্রমাদিত্যকে রেখে বিদায় নিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই প্রবীণ অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুতে বলিউড হারাল এমন এক শিল্পীকে, যিনি প্রমাণ করেছিলেন নায়ক না হয়েও একজন অভিনেতা দর্শকের স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকতে পারেন। অনেক বছর পরও যখন গজনি ছবির কথা উঠবে, দর্শকের মনে প্রথম ভেসে উঠবে সেই নির্মম খলনায়কের মুখ। আর সেই মুখের আড়ালেই থেকে যাবে একজন বিনয়ী মানুষের গল্প, যার নাম প্রদীপ সিং রাওয়াত।