সৌদির আগুনে ১৬ প্রাণ: কেন ঘটে এমন দুর্ঘটনা, ক্ষতিপূরণ পেতে কী করবেন পরিবার

প্রিয়দেশ ডেস্ক
10 August 2026 2:09 pm
সৌদি আরবের মতো দেশে এরকম অগ্নিকাণ্ড প্রবাসীদের ভাবিয়ে তুলেছে।

সৌদি আরবের মতো দেশে এরকম অগ্নিকাণ্ড প্রবাসীদের ভাবিয়ে তুলেছে।

৯ আগস্ট, রোববার। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় হঠাৎই আগুনের সূত্রপাত হয়। স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে শুরু হওয়া এই আগুন মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো কারখানায়, আর ভেতরে আটকা পড়েন কর্মরত শ্রমিকেরা। সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল সংকটাপন্ন, রাত ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের সম্মিলিত চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

প্রথম দিকে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল, কোথাও সাত, কোথাও দশ, আবার কোথাও সতেরো জনের কথা বলা হচ্ছিল। রাত গড়াতেই প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে, নিহতের সংখ্যা ১৬ জন এবং তাঁদের সবাই বাংলাদেশি নাগরিক। আগুনে দগ্ধ হওয়ায় মরদেহ শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে জানান দূতাবাস কর্মকর্তারা। মরদেহগুলো উদ্ধারের পর রাত ১১টার দিকে কিং সৌদ হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়, তাঁদের মধ্যে একই গ্রামের চারজনও রয়েছেন। বাকিদের মধ্যে নাটোরের নলডাঙ্গা ও বাগমারা উপজেলার কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। কয়েকজনের পরিচয় শনাক্তের কাজ এখনো চলমান। ঘটনার পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও প্রতিবেশী গ্রামগুলোয় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, একই পরিবারের বাবা ও দুই ছেলে একসঙ্গে প্রাণ হারানোর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও উঠে এসেছে স্থানীয় সূত্রে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী পৃথক শোকবার্তায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।

সৌদি আরবের মতো দেশেও কেন ঘটে এমন দুর্ঘটনা?

প্রশ্নটা স্বাভাবিক, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সম্পদের দিক থেকে সৌদি আরব একটি অত্যাধুনিক দেশ। তাহলে সেখানেও কেন বারবার শ্রমিক-অধ্যুষিত কারখানায় এমন প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ড ঘটে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে কয়েকটি কাঠামোগত বাস্তবতায়, যা কেবল সৌদি আরব নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশেই শ্রমঘন শিল্প খাতে সাধারণভাবে দেখা যায়।

দাহ্য পদার্থে ঠাসা কর্মপরিবেশ: সোফা বা আসবাবপত্র তৈরির কারখানায় সাধারণত ফোম, স্পঞ্জ, কাঠ, আঠা ও নানা রকম কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয়, এই উপকরণগুলো অত্যন্ত দ্রুত আগুন ধরে এবং ছড়িয়ে পড়ে। একবার আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই পুরো কর্মস্থল গ্রাস করে ফেলতে পারে, যেমনটা এবারও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সূত্র।

ছোট, ঘিঞ্জি ও অনুমোদনহীন কর্মস্থল: উপসাগরীয় দেশগুলোর অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা শিল্প এলাকার সংকীর্ণ গলিতে গড়ে ওঠে, যেখানে জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের সুযোগ থাকে না বললেই চলে। বড় শহরের ঝকঝকে অবকাঠামোর বাইরে এই ধরনের শিল্প এলাকাগুলো প্রায়ই থেকে যায় নিয়মিত পরিদর্শনের বাইরে।

অনিয়মিত অগ্নি নিরাপত্তা তদারকি: আইন থাকলেও প্রতিটি ছোট কারখানায় নিয়মিত অগ্নি নিরাপত্তা পরিদর্শন, ফায়ার অ্যালার্ম ব্যবস্থা বা স্প্রিংকলার সিস্টেমের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা কঠিন, বিশেষত এমন কারখানায়, যেখানে বিদেশি শ্রমিকেরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন এবং মালিকপক্ষের নজরদারি সীমিত।

অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও ঘনবসতিপূর্ণ কর্মস্থল: অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কর্মস্থলেই সংকীর্ণ পরিসরে বেশি সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন, ফলে আগুন লাগলে দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ কমে যায়। আগুন ছড়িয়ে পড়ার গতির তুলনায় নিরাপদে বের হওয়ার সময় ও পথ, দুটোই থাকে অপ্রতুল।

তদন্তের অপেক্ষা: এই নির্দিষ্ট ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, সৌদি কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। বৈদ্যুতিক ত্রুটি, শর্ট সার্কিট বা যান্ত্রিক ত্রুটি—এসবই সাধারণত এ ধরনের কারখানায় আগুন লাগার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়, যদিও এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কারণ প্রকাশের অপেক্ষায় থাকতে হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশ আধুনিক হলেও অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থল, বিশেষ করে ছোট মাপের উৎপাদন ইউনিট, প্রায়ই সেই আধুনিকতার আওতার বাইরে থেকে যায়। এটি শুধু সৌদি আরবের চিত্র নয়, বরং প্রবাসী শ্রমিকপ্রধান প্রায় সব দেশেরই একটি সাধারণ ও পুনরাবৃত্ত সমস্যা।

প্রবাসে মৃত্যু হলে পরিবার কী কী সুবিধা পায়?

বিদেশে কর্মরত অবস্থায় কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক মারা গেলে তাঁর পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।

১. সরকারি আর্থিক অনুদান ৩ লাখ টাকা

বৈধভাবে বিদেশে গমনকারী যেকোনো বাংলাদেশি কর্মী প্রবাসে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার বা মনোনীত ওয়ারিশ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান পান। আবেদন সম্পন্ন ও কাগজপত্র যাচাই শেষে সাধারণত ছয় মাসের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধের নিয়ম রয়েছে।

২. বাধ্যতামূলক প্রবাসী বীমা সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত

২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে বিদেশগামী সব কর্মীর জন্য বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিএমইটি স্মার্ট কার্ড নেওয়ার সময় এই বীমা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়। বীমার মেয়াদ চলাকালীন কোনো কর্মী স্বাভাবিক বা দুর্ঘটনাজনিত যেকোনো কারণে মারা গেলে জীবন বীমা কর্পোরেশনের মাধ্যমে নমিনি নির্দিষ্ট অঙ্কের বীমা সুবিধা পান।

অর্থাৎ সরকারি অনুদান ও বীমা, দুটো মিলিয়ে একজন প্রবাসী কর্মীর পরিবার সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পেতে পারে, যদি সব শর্ত ও কাগজপত্র সঠিক থাকে।

৩. মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া পাওনা আদায়ে সহায়তা

উপরোক্ত সরকারি অনুদান ও বীমার বাইরেও, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি কোম্পানির কাছে পাওনা বেতন, সার্ভিস বেনিফিট বা কোম্পানির নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ থাকলে, তা আদায়ে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রম কল্যাণ উইং সহায়তা করে থাকে। এই অর্থের পরিমাণ নির্ভর করে কর্মীর নিয়োগকারীর নীতি, চুক্তির শর্ত এবং সেই দেশের শ্রম আইনের ওপর।

৪. মরদেহ দেশে আনা ও দাফনে সহায়তা

মৃত কর্মীর মরদেহ বিনা খরচে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থাও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের একটি নিয়মিত সেবা। পরিবার চাইলে স্থানীয়ভাবেই (অর্থাৎ ওই দেশে) দাফনের ব্যবস্থাও নিতে পারে, সে ক্ষেত্রেও দূতাবাসের মাধ্যমে সহায়তা পাওয়া যায়।

পরিবার কীভাবে এই ক্ষতিপূরণ পাবে, ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া

প্রবাসে মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরিবারকে সাধারণত নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়:

প্রথম ধাপ—দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ: সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রম কল্যাণ উইং সাধারণত মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। পরিবারকেও উচিত দূতাবাসের হটলাইন বা স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ করা।

দ্বিতীয় ধাপ—প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ: ক্ষতিপূরণ ও বীমা দাবির জন্য সাধারণত প্রয়োজন হয়—

  • মৃত কর্মীর পাসপোর্টের সত্যায়িত কপি
  • বিএমইটি স্মার্টকার্ডের কপি
  • মৃত্যু সনদ (দূতাবাস কর্তৃক সত্যায়িত)
  • ওয়ারিশ সনদ ও নমিনি নির্ধারণী কাগজপত্র
  • দায়মুক্তি সনদ, অঙ্গীকারনামা ও ক্ষমতা অর্পণপত্র (ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নির্ধারিত নমুনা অনুযায়ী)
  • নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য

তৃতীয় ধাপ—আবেদন দাখিল: এসব কাগজপত্র নিয়ে পরিবারকে যোগাযোগ করতে হয় নিজ জেলার জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরো অফিসে অথবা জীবন বীমা কর্পোরেশনের নির্ধারিত ডেস্কে। বর্তমানে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ বা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ওয়েবসাইটের (wewb.gov.bd) মাধ্যমেও প্রাথমিক আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

চতুর্থ ধাপ—যাচাই ও অর্থ ছাড়: কাগজপত্র যাচাই শেষে সাধারণত আবেদনের ১ থেকে ৩ মাসের মধ্যে সরকারি অনুদান ও বীমার অর্থ নমিনির ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। সরকারি অনুদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সময়সীমা ছয় মাস বলে উল্লেখ রয়েছে।

পঞ্চম ধাপ—মরদেহ ফেরত বা স্থানীয় দাফন: সমান্তরালে দূতাবাসের মাধ্যমে মরদেহ দেশে ফেরত আনা বা স্থানীয়ভাবে দাফনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়, যার আবেদনও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে করতে হয়।

এই দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এখন কী হচ্ছে

রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ইতিমধ্যে নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ ও মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেছে। দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর মোহাম্মদ রেজায়ে রাব্বী নিহতের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন, আর স্থানীয় সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলছে শনাক্তকরণের কাজ, যা আগুনে দগ্ধ হওয়া মরদেহের কারণে জটিল হয়ে পড়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায়—সরকারি অনুদান, বীমা দাবি এবং মরদেহ ফেরত আনার প্রক্রিয়া এখন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জন্য।

সৌদি আরবের মতো অবকাঠামোগতভাবে উন্নত একটি দেশেও এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রমাণ করে, শ্রমঘন ছোট কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায়ই দেশটির সামগ্রিক আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। এই ঘটনার প্রকৃত কারণ পুরোপুরি জানতে অপেক্ষা করতে হবে তদন্তের জন্য। তবে ইতিমধ্যেই যা স্পষ্ট, তা হলো, ১৬টি পরিবারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় দুটি: প্রিয়জনের মরদেহ দ্রুত হাতে পাওয়া, আর সরকারি অনুদান ও বীমার প্রাপ্য অর্থ যথাসময়ে নিশ্চিত হওয়া। এ ক্ষেত্রে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎপরতাই হবে পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় ভরসা।