শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে ভারত

বিশেষ প্রতিনিধি
31 July 2026 4:18 pm
৫ই আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থাণে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা।

৫ই আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থাণে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ঢাকার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ বর্তমানে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনি বিধান ও প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসারে পরীক্ষা করে দেখছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির সংসদের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে এ তথ্য জানিয়েছে। কমিটির চেয়ারম্যান কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃত্বে প্রস্তুত হওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধটি আইন অনুযায়ী বিবেচনায় রয়েছে এবং বিষয়টির অগ্রগতি সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকার যেন সংসদীয় কমিটিকে নিয়মিত অবহিত করে।

ভারতের পক্ষ থেকে কমিটিকে আরও জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনাকে দেশটির ভূখণ্ডে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ভারত দীর্ঘদিন ধরে মানবিক নীতির অংশ হিসেবে সংকটাপন্ন বিদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আশ্রয় দিয়ে এলেও তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেয় না। এই নীতিই শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও অনুসরণ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারানোর পর ভারত চলে যান। টানা কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার বিচার শুরু হয়। পরে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে তাঁর প্রত্যর্পণ চায়। ভারত শুরু থেকেই জানিয়ে আসছে, প্রত্যর্পণ প্রশ্নে যে কোনো সিদ্ধান্ত দুই দেশের চুক্তি, দেশীয় আইন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসারেই নেওয়া হবে।

ভারতের সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন, বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং নদীর পানি বণ্টনসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন। কমিটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে আরও বাস্তবভিত্তিক ও পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি এখন শুধু একটি বিচারিক বা আইনি বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশ ও ভারতের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একদিকে বাংলাদেশ চাইছে আদালতের রায় কার্যকর করতে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। অন্যদিকে ভারত এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে চায়, যাতে আইনি বাধ্যবাধকতা, মানবিক বিবেচনা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য একসঙ্গে বজায় থাকে। ফলে বিষয়টি নিয়ে নয়াদিল্লি অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি সাংবাদিকদেরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারত পেয়েছে এবং সেটি বর্তমানে আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক নয়, বরং আইনি কাঠামোই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে বলে তিনি স্পষ্ট করেন।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত এবং আদালতেই নিজের অবস্থান তুলে ধরতে চান। তবে বাংলাদেশ সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াই এগিয়ে নিচ্ছে এবং জানিয়েছে, দেশে ফিরে এলে তাঁর বিচার আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হবে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নের নিষ্পত্তি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আইনি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের গতিপথও অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: দ্য ওয়্যার, রয়টার্স, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য ইকোনমিক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, ইন্ডিয়া টুডে, বিবিসি।