বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে এমন নজির আগে দেখা যায়নি। একসময় দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষে থাকা একজন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এখন বিদেশের একটি ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার, কারাবাস, এরপর শর্তসাপেক্ষ জামিন এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের নতুন আইনি উদ্যোগ পুরো ঘটনাকে নতুন মোড়ে নিয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর এখনো জানা নেই কারো। বেনজীর আহমেদ কি সত্যিই মুক্ত হয়েছেন, নাকি বিষয়টি এখনো যাচাইয়ের পর্যায়ে?
রোববার দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, দুবাইয়ের একটি আদালত জামিন আবেদন মঞ্জুর করার পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কয়েকটি প্রতিবেদনে দুবাই সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়, আদালত তার পাসপোর্ট জব্দ রেখেছে এবং বিচারিক অনুমতি ছাড়া তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করতে পারবেন না। অর্থাৎ তিনি মুক্ত হলেও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।
কিন্তু এই তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি বাংলাদেশ সরকার। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদের জামিন বা মুক্তি সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো সরকারি বার্তা পৌঁছায়নি। একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনও। দুদকের মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী বলেছেন, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য তারা দেখেছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি বা আদালতের আদেশ তাদের হাতে আসেনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও বলছেন, বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। দুবাই পুলিশ কিংবা আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছ থেকেও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। ফলে বেনজীর আহমেদের মুক্তির খবর নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। যদিও তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, গত বৃহস্পতিবার তিনি কারাগার থেকে বের হয়েছেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগও হয়েছে।
এই অবস্থার মধ্যেই বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সরকার বেনজীর আহমেদের জামিন বাতিল করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দুবাইয়ে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছে। সরকারের লক্ষ্য হলো দুবাই আদালতের আদেশের সত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহ করে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনের বিরোধিতা করা এবং প্রত্যর্পণের পথকে আরও কার্যকর করা।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানেই মামলাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। কারণ একজন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় আদালত জামিন দিলে বিষয়টি আর কেবল পুলিশি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন সংশ্লিষ্ট দেশের বিচারব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা, প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং আদালতের সিদ্ধান্ত একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল কাজ। প্রথমত, আদালতে চলমান প্রক্রিয়ায় নিজেদের আইনি অবস্থান শক্তিশালী করা। দ্বিতীয়ত, প্রত্যর্পণের পক্ষে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য আইনি ভিত্তি উপস্থাপন করা।
এই ঘটনার সূত্রপাত কয়েক মাস আগে। দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়, ইন্টারপোলের সহযোগিতা এবং দুবাই পুলিশের অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১২ জুন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে অবহিত করা হয়। সেই সময় ঘটনাটি দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন হিসেবে আলোচিত হয়। কারণ স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো সাবেক আইজিপিকে বিদেশে গ্রেপ্তারের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল।
এরপর থেকেই প্রশ্ন ওঠে, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভব। আন্তর্জাতিক আইনে প্রত্যর্পণ কখনোই স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের অবস্থান এবং দুই দেশের পারস্পরিক আইনি সহযোগিতার কাঠামোর ওপর পুরো বিষয়টি নির্ভর করে। ফলে গ্রেপ্তার যেমন প্রত্যর্পণের নিশ্চয়তা নয়, তেমনি জামিনও মামলার সমাপ্তি নয়।
বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ পদক্ষেপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তারা এখনো আশাবাদী। তবে কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, প্রত্যর্পণ আবেদন এবং দুবাইয়ের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।