ছয় মাসে নিখোঁজ ৩৪০০ শিশু! খবরে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
1 August 2026 3:17 pm
এই নিখোঁজের খবরে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এই নিখোঁজের খবরে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

দেশে গত ছয় মাসে অন্তত ৩ হাজার ৪০০ শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এই তথ্য খোদ শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা জাতীয় জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা মুন এলার্টের। এরপরই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি শিশু নিরাপত্তা, মানবপাচার, পারিবারিক সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেতও।

মুন এলার্ট বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় জরুরি শিশু অনুসন্ধান ও সতর্কতা ব্যবস্থা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিআইডির মিসিং চিলড্রেন সেলের উদ্যোগে এটি চালু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বার এলার্ট ব্যবস্থার আদলে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য হলো কোনো শিশু নিখোঁজ বা অপহৃত হওয়ার তথ্য যাচাইয়ের পর দ্রুত সারা দেশে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিয়ে তাকে উদ্ধারে জনসাধারণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মকে একসঙ্গে যুক্ত করা। ফেসবুক, ডিজিটাল বিলবোর্ড, সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিখোঁজ শিশুর তথ্য দ্রুত প্রচারের মাধ্যমে উদ্ধারের সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা করে মুন এলার্ট।

মুন এলার্টের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া শিশুদের সবাই অপহরণের শিকার নয়। অনেক শিশু পরিবার ছেড়ে চলে যায়, কেউ পথ হারায়, কেউ আবার বিভিন্ন অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে। তবে প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনাকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ প্রথম কয়েক ঘণ্টাকেই শিশু উদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই নিখোঁজের পরপর অভিযোগ করতে পরিবার দেরি করে। আবার সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা ভুল ধারণার কারণেও অনেক ঘটনা শুরুতে পুলিশের কাছে পৌঁছায় না। এতে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয় এবং শিশুকে উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো শিশু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি না ফিরলে অপেক্ষা না করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো উচিত।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, নিখোঁজ শিশুদের একটি অংশ পরে পরিবারের কাছে ফিরে এলেও একটি অংশ মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন নির্যাতন কিংবা সংগঠিত অপরাধচক্রের ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা, বড় শহর এবং পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মুন এলার্ট চালুর পর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদ্ধার অভিযানে সফলতা এসেছে। এর মধ্যে ঢাকার মিরপুর থেকে নিখোঁজ এক শিশুকে মাত্র ২৩ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। এছাড়া ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সতর্কবার্তা দেখে সাধারণ মানুষের তথ্যের ভিত্তিতেও কয়েকটি শিশু পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করছেন, দেশের প্রতিটি থানা, ব্যাংকের ডিজিটাল ডিসপ্লে, পরিবহন কেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে জাতীয় পর্যায়ের এই সতর্কতা ব্যবস্থা এখনও পুরো সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেনি।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, মুন এলার্ট কার্যকর করতে শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন জনসচেতনতা। মানুষ যদি সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেয়, সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায় এবং নিখোঁজ শিশুর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, তাহলে উদ্ধার হার আরও বাড়তে পারে।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, নিখোঁজের সংখ্যা কমাতে পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন নিরাপত্তা, শিশুদের ডিজিটাল সচেতনতা এবং মানবপাচার প্রতিরোধেও জোর দিতে হবে।