ফাইনালে হাতাহাতি: ফিফার তদন্তের মুখে আর্জেন্টিনা

ক্রীড়া প্রতিবেদক
21 July 2026 3:52 pm
ম্যাচ শেষে হাতাহাতিতে জড়ান আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা।

ম্যাচ শেষে হাতাহাতিতে জড়ান আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা।

শুধু লাল কার্ড নয়, নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানার ঝুঁকিতেও বিশ্বকাপের রানার্সআপরা; অতীতের বিতর্কও বাড়াচ্ছে চাপ।

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর যে দৃশ্যটি দেখা গেছে, তা ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চের মর্যাদার সঙ্গে একেবারেই বেমানান বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। স্পেনের ঐতিহাসিক শিরোপা জয়ের আনন্দ যখন মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই মাঠের অন্য প্রান্তে শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি, উত্তেজনা ও হাতাহাতি। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বিষয়ক সম্ভাব্য লঙ্ঘনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একজন প্রসিকিউটর নিয়োগ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে খেলোয়াড়, কোচ কিংবা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)-এর বিরুদ্ধে জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

ফিফার শৃঙ্খলা বিধিমালায় খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের আচরণকে শুধু মাঠের ভেতরের ঘটনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয় না। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও যদি কোনো খেলোয়াড় বা কর্মকর্তা সহিংসতা, অশোভন আচরণ, প্রতিপক্ষকে হেনস্তা কিংবা ফুটবলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সেটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এবারও তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু সেই প্রশ্ন: ফাইনাল শেষে আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় ও স্টাফ কি ফিফার ‘ফেয়ার প্লে’ নীতিমালা ভঙ্গ করেছেন?

ঘটনার সূত্রপাত হয় অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনার হতাশা থেকে। শেষ বাঁশি বাজতেই স্পেনের ফুটবলাররা যখন শিরোপা উদযাপনে ব্যস্ত, তখন দুই দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। টেলিভিশন সম্প্রচার এবং বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার নাহুয়েল মোলিনা, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, থিয়াগো আলমাদা এবং সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালা হাতাহাতির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছেন। স্পেনের এরিক গার্সিয়া, গাভি, দানি ওলমোসহ কয়েকজন খেলোয়াড়ও পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন। এক পর্যায়ে গলাটিপে ধরা, ধাক্কাধাক্কি এবং হাতাহাতির মতো দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

প্রথমদিকে ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারি স্লাভকো ভিনচিচের ম্যাচ রিপোর্টে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে লাল কার্ড দেখানোর তথ্য উঠে আসে। পরে ফিফা সেটি সংশোধন করে জানায়, ম্যাচ-পরবর্তী ওই ঘটনার জন্য মাঠে আর কোনো আনুষ্ঠানিক কার্ড দেখানো হয়নি। তবে মাঠে কার্ড না দেখানো মানেই যে ঘটনাটি শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। ফিফার শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী, ভিডিও, ম্যাচ কমিশনারের প্রতিবেদন, রেফারির অতিরিক্ত রিপোর্ট এবং বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তীতেও তদন্ত ও শাস্তি দেওয়া যায়। ফলে মাঠে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এখন পুরো ঘটনাই নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে।

ফাইনালে আর্জেন্টিনা আগেই বড় ধাক্কা খেয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফের্নান্দেস। ফলে অতিরিক্ত সময়ের শেষ অংশে দশজন নিয়ে খেলতে হয় দলটিকে। সেই হতাশা ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও অনেক খেলোয়াড়ের আচরণে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার বিবিসির সরাসরি সম্প্রচারে বলেন, পরাজয়ের কষ্ট তিনি বোঝেন, কিন্তু তারও একটি সীমা আছে। তাঁর ভাষায়, পারেদেস যেভাবে প্রতিপক্ষের দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন, তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। একই অনুষ্ঠানে সাবেক গোলরক্ষক জো হার্টও মন্তব্য করেন, ম্যাচে স্পষ্টভাবে পিছিয়ে থাকা একটি দলের এমন প্রতিক্রিয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁদের মতে, বড় দলের পরিচয় শুধু জয়ে নয়, পরাজয় মেনে নেওয়ার মধ্যেও ফুটে ওঠে।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য তুলনামূলক সংযত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, জয়ের সময় যেমন উদার হতে হয়, পরাজয়ের সময়ও তেমনি মর্যাদা ধরে রাখতে হয়। তিনি স্বীকার করেন যে দল হেরেছে, তবে সেই হার তাদের পুরো যাত্রাকে মুছে দেয় না। মাঠে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টাও তাঁকে করতে দেখা গেছে।

তবে এই তদন্ত শুধু ফাইনালের ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জয়ের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে রাজনৈতিক বার্তাসংবলিত ব্যানার প্রদর্শনের অভিযোগে এএফএর বিরুদ্ধে পৃথক শৃঙ্খলাগত প্রক্রিয়া শুরু করেছে ফিফা। ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস’, অর্থাৎ ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’ লেখা ব্যানার প্রদর্শনকে অনেকেই ফুটবলের মাঠে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। ফিফার নীতিমালা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ম্যাচে রাজনৈতিক, জাতিগত বা আদর্শিক বার্তা প্রদর্শন কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়।

আর্জেন্টিনার জন্য এটি অবশ্য নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পরও তাদের কয়েকজন খেলোয়াড়ের আচরণ ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ গোল্ডেন গ্লাভস ট্রফি নিয়ে অশোভন অঙ্গভঙ্গি করেন এবং পরে ড্রেসিংরুমে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে নিয়ে বিদ্রূপ করার ঘটনাও আলোচনায় আসে। সে সময় এএফএকে জরিমানা করা হলেও কোনো খেলোয়াড়কে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি।

এরপরও মার্তিনেজ বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে পারেননি। কোপা আমেরিকার প্রতিরূপ ট্রফি নিয়ে অশোভন উদযাপন এবং একটি ম্যাচ শেষে ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরায় আঘাত করার ঘটনায় তাঁকে দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।

এনজো ফের্নান্দেসও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ফ্রান্সের কৃষ্ণাঙ্গ ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক স্লোগান গাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিন্দা করেছিল। ফলে শৃঙ্খলা ও আচরণ নিয়ে আর্জেন্টিনা দলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রশ্ন নতুন নয়।

ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির হাতে শাস্তির বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে। সতর্কবার্তা, আর্থিক জরিমানা, নির্দিষ্টসংখ্যক ম্যাচে নিষেধাজ্ঞা, কর্মকর্তাদের ডাগআউটে নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর শাস্তি, সবই তাদের আওতায়। অতীতের নজিরও সেটিই বলে। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ইতালির জর্জিও কিয়েলিনিকে কামড় দেওয়ার ঘটনায় উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজকে চার মাস সব ধরনের ফুটবল কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অন্যদিকে স্পেনের নারী বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার জেনি এরমোসোকে অনুমতি ছাড়া চুম্বন করার ঘটনায় সাবেক স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি লুইস রুবিয়ালেসকে তিন বছরের জন্য ফুটবল-সংশ্লিষ্ট সব কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।

যদিও বর্তমান ঘটনার সঙ্গে এসব ঘটনার প্রকৃতি এক নয়, তবু ফিফা অতীতে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সেটি তদন্তের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

ক্রীড়া আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিফার শৃঙ্খলা তদন্তে শুধু ঘটনাটি নয়, অভিযুক্তদের পূর্ববর্তী আচরণ, ম্যাচের প্রেক্ষাপট, ভিডিও প্রমাণ, রেফারির প্রতিবেদন এবং ঘটনার তীব্রতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য শাস্তি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

বিশ্বকাপ ফাইনালকে সাধারণত ফুটবলের সর্বোচ্চ উৎসব হিসেবে দেখা হয়। সেই মঞ্চে শিরোপা উদযাপনের বদলে হাতাহাতি ও উত্তেজনার দৃশ্য ফুটবলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। স্পেন তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ইতিহাস লিখলেও, আর্জেন্টিনার জন্য ফাইনালের শেষ কয়েক মিনিট এখন পরিণত হয়েছে শৃঙ্খলা তদন্ত, সম্ভাব্য শাস্তি এবং নতুন বিতর্কের সূচনাবিন্দুতে। তদন্ত শেষ হলে শুধু কয়েকজন খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে আচরণবিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।