বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি ইউরোপ সেরা স্পেন ও বিশ্বসেরা আর্জেন্টিনা। মাঠে নির্ধারিত হবে, চার বছর পর বিশ্বের সেরা ফুটবল দল কোনটি। কিন্তু ফাইনালের বাঁশি বাজার আগেই আরও এক বিজয়ী পক্ষের নাম নিশ্চিত হয়ে গেছে। সেই বিজয়ী কোনো ফুটবলার নয়, কোনো কোচও নয়। পক্ষটি একটি ব্র্যান্ড, যার নাম অ্যাডিডাস।
ফাইনালে ওঠা দুটি দলই অ্যাডিডাসের জার্সি পরে খেলছে। বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বলও অ্যাডিডাসের তৈরি। প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারও তারাই। ফলে ট্রফি স্পেন ঘরে তুলুক কিংবা আর্জেন্টিনা, বিজয়মঞ্চে শেষ পর্যন্ত হাসবে অ্যাডিডাসেরই লোগো।
এটি নিছক কাকতালীয় নয়। বরং এক শতাব্দীর পরিকল্পনা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও বিপণন কৌশলের ফল।
আজকের এই আধিপত্যের শুরু হয়েছিল জার্মানির ছোট্ট শহর হারৎসোগেনাউরাখের একটি সাধারণ বাড়ির ধোয়ার ঘরে। সেখানে যুদ্ধশেষে পুরোনো সামরিক সরঞ্জাম, চামড়া ও কাপড় দিয়ে ক্রীড়াবিদদের জন্য জুতা বানাতে শুরু করেছিলেন এক তরুণ। তাঁর নাম আডলফ (আদি) ড্যাসলার।

অ্যাডিডাসের প্রথম ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড জুতা।
তখন তিনি ভাবতেও পারেননি, একদিন তাঁর তৈরি তিন ফিতার চিহ্ন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ দখল করে নেবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন আদি ড্যাসলার বিশ্বাস করতেন, একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স বদলে দিতে পারে একটি ভালো জুতা। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি নিজের বাড়িতেই ছোট পরিসরে জুতা তৈরি শুরু করেন। পরে ভাই রুডলফ ড্যাসলারকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ড্যাসলার ব্রাদার্স জুতা কারখানা।
খুব অল্প সময়েই সেই জুতা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের নজর কাড়ে। ১৯২৮ সালের আমস্টারডাম অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো তাঁদের তৈরি জুতা পরে অংশ নেন কয়েকজন ক্রীড়াবিদ। জার্মান দৌড়বিদ লিনা রাডকে সেই জুতা পরে স্বর্ণপদক জেতেন।
কিন্তু আদি ড্যাসলারের জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে।
নাৎসি জার্মানির রাজধানীতে কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন অ্যাথলেট জেসি ওয়েন্স তাঁর তৈরি স্পাইকযুক্ত জুতা পরে চারটি স্বর্ণপদক জয় করেন। সেই বিজয় শুধু অ্যাডলফ হিটলারের বর্ণবাদী মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জ জানায়নি, আদি ড্যাসলারকেও বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে।
এরপর আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে দুই ভাইয়ের পথ আলাদা হয়ে যায়। রুডলফ প্রতিষ্ঠা করেন পুমা। আর ১৯৪৯ সালে আদি প্রতিষ্ঠা করেন অ্যাডিডাস। নিজের ডাকনাম আডি এবং পদবি ড্যাসলার—এই দুই অংশ মিলিয়েই তৈরি হয় নামটি। একই সঙ্গে নিবন্ধন করেন তিনটি সমান্তরাল ফিতাকে প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র পরিচয় হিসেবে। আজ সেই তিন ফিতা পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান ব্র্যান্ড প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
আদি ড্যাসলারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রযুক্তি। তিনি কারখানায় বসে জুতা বানাতেন না; মাঠে গিয়ে খেলোয়াড়দের কথা শুনতেন। কার কোথায় চাপ পড়ছে, কোথায় অস্বস্তি হচ্ছে, কোন মাঠে কী ধরনের স্টাড দরকার, সবকিছু নোট করে পরবর্তী সংস্করণে পরিবর্তন আনতেন।
এই দর্শনেরই বড় প্রমাণ ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ। বৃষ্টিভেজা মাঠের জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন বদলানো যায় এমন স্টাডযুক্ত বুট। সেই প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে পশ্চিম জার্মানি শক্তিশালী হাঙ্গেরিকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ফুটবল ইতিহাসে ম্যাচটি আজও বার্নের অলৌকিক ঘটনা নামে পরিচিত।
সেখান থেকেই ফুটবলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের এক নতুন যুগ শুরু হয়।

আদি ড্যাসলার ভাবতেও পারেননি, একদিন তাঁর তৈরি তিন ফিতার চিহ্ন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ দখল করে নেবে।
সত্তর বছরের বেশি সময় পরে অ্যাডিডাস এখন শুধু একটি ক্রীড়া সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ফুটবলের অর্থনীতি, বিপণন ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান শক্তি।
ফিফার সঙ্গে তাদের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল থেকে শুরু করে অসংখ্য জাতীয় দলের জার্সি, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম, রেফারিদের পোশাক, সবখানেই রয়েছে অ্যাডিডাসের রাজত্ব।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে প্রতিষ্ঠানটি ১৪টি জাতীয় দলের জার্সি সরবরাহ করেছে। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে উঠেছে স্পেন ও আর্জেন্টিনা, দুই দলই অ্যাডিডাস পরিবারের।
অন্যদিকে নাইকির পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ব্রাজিল, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলগুলো ফাইনালে পৌঁছাতে পারেনি।
ফলে ব্র্যান্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অ্যাডিডাসের জন্য এক অনন্য সাফল্য।
বিশ্বকাপের ফাইনাল কেবল ট্রফির লড়াই নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া বিজ্ঞাপনও। এই একটি ম্যাচ কোটি কোটি মানুষ সরাসরি দেখেন। যে ব্র্যান্ডের জার্সি, বল ও তারকা খেলোয়াড় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান থাকে, তার বাজারমূল্যও তত বাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, একই প্রতিষ্ঠানের দুটি দল ফাইনালে ওঠা বিপণনের দৃষ্টিতে বিরল ঘটনা। এর প্রভাব শুধু জার্সি বিক্রিতেই নয়; ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা, ভবিষ্যৎ চুক্তি এবং শেয়ারবাজারের মূল্যায়নেও পড়ে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ষড়যন্ত্রতত্ত্বও ছড়িয়েছে। অনেকে দাবি করছেন, ফিফার বড় পৃষ্ঠপোষক হওয়ায় অ্যাডিডাস নাকি বিশেষ সুবিধা পেয়েছে।

আর্জেন্টিনার তারকা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি খেলছেন অ্যাডিডাস পরে।
তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই। ফুটবলের ফল নির্ধারণ করে মাঠের পারফরম্যান্স। রেফারিং, প্রতিযোগিতা পরিচালনা ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব, সবই পৃথক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়। ইতিহাসও বলে, বিশ্বকাপে অ্যাডিডাস, নাইকি ও পুমা, সব ব্র্যান্ডের দলই বিভিন্ন সময় শিরোপা জিতেছে।
বরং এবারের বিশ্বকাপে অ্যাডিডাসের আধিপত্যের পেছনে রয়েছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। তারা শুধু জার্সি বিক্রি করেনি; ফুটবলের সঙ্গে নিজেদের এমনভাবে যুক্ত করেছে যে, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের অনেকেই তাদের ব্র্যান্ডের মুখ।
লিওনেল মেসি বহু বছর ধরেই অ্যাডিডাসের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন। নতুন প্রজন্মে সেই জায়গা দ্রুত দখল করছেন লামিনে ইয়ামাল। বিশ্বকাপের ফাইনালে এই দুই প্রজন্মের দুই তারকাই অ্যাডিডাসের জার্সি পরে মাঠে নামবেন।
এ যেন ইতিহাসের এক অদ্ভুত পূর্ণতা।

লামিনে ইয়ামাল খেলছেন এই বুট পরে।
একসময় পরিবারের কাপড় ধোয়ার ঘরে বসে একজন তরুণ যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ সেই স্বপ্নের প্রতীক বিশ্বকাপের ফাইনালের প্রতিটি ফ্রেমে।
তাই স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হোক কিংবা আর্জেন্টিনা, ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনটি ইতোমধ্যেই জিতে গেছে।
অন্তত ব্র্যান্ডের লড়াইয়ে, স্পেন-আর্জেন্টিনার আগেই জিতে গেছে অ্যাডিডাস।
সূত্র: ডিজাইনবুম, অ্যাডিডাস আর্কাইভ, ফিফা, রয়টার্স, অলিম্পিক আর্কাইভ, মর্নিংস্টার, এম সায়েন্স।