ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের ফাইনালের আগে তাই স্পেন–আর্জেন্টিনা ম্যাচের পাশাপাশি আরেকটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ফকল্যান্ড।
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করার আনন্দে মাতলো আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষ বাঁশির পর মাঠে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় পরিণত হয়েছে। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় দর্শকসারি থেকে আসা একটি ব্যানার হাতে তুলে ধরেন। তাতে লেখা ছিল, “লাস মালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস” অর্থাৎ, “ফকল্যান্ড (মালভিনাস) আর্জেন্টিনার।” সেই ছবি মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন করে আলোচনায় আসে দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ড, যা আর্জেন্টিনায় ‘ইসলাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত।
ঘটনার পর যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী পিটার কাইল এটিকে “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেন এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য ফিফার প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বকাপ রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার মঞ্চ হতে পারে না। ফিফার স্টেডিয়াম আচরণবিধিতেও রাজনৈতিক, বৈষম্যমূলক বা উসকানিমূলক ব্যানার ও স্লোগান নিষিদ্ধ। ফলে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে এখন জোর আলোচনা চলছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফিফা আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
এই বিতর্ক বোঝার জন্য ফিরে যেতে হয় ইতিহাসে। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে তিন হাজারের মতো। বর্তমানে এটি যুক্তরাজ্যের একটি স্বশাসিত ওভারসিজ টেরিটরি। কিন্তু আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, দ্বীপপুঞ্জটি তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ড এবং ১৮৩৩ সালে ব্রিটেন অবৈধভাবে সেটির নিয়ন্ত্রণ দখল করে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের অবস্থান হলো, দ্বীপের বাসিন্দারাই তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন এবং তারা ব্রিটিশ শাসনের অধীনেই থাকতে চান। ২০১৩ সালের গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দা ব্রিটিশ শাসনের পক্ষেই মত দেন। আর্জেন্টিনা অবশ্য সেই গণভোটকে কখনোই বৈধ বলে স্বীকার করেনি।
ফকল্যান্ড নিয়ে দুই দেশের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয় ১৯৮২ সালে। সে বছরের ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা দ্বীপটি দখল করে। এর জবাবে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার নৌবাহিনী পাঠান। প্রায় ১০ সপ্তাহের যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ বাহিনী দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করে। এই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং তিনজন বেসামরিক দ্বীপবাসী নিহত হন। যুদ্ধটি শুধু দুই দেশের সম্পর্ককেই দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করেনি, আর্জেন্টিনার সামরিক সরকারের পতনের পথও ত্বরান্বিত করেছিল।
ফকল্যান্ড ইস্যু আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দেশটির প্রায় সব রাজনৈতিক দলই দ্বীপটির ওপর আর্জেন্টিনার দাবি সমর্থন করে। সে কারণেই ফুটবল মাঠেও ‘মালভিনাস’ প্রায়ই আবেগের প্রতীক হয়ে ওঠে। ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী দলের জনপ্রিয় গানেও মালভিনাসের উল্লেখ ছিল। এবারও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর সেই আবেগই আবার সামনে চলে আসে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের কাছে বিষয়টি কেবল ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়; এটি দ্বীপবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রক্ষার বিষয়। ব্রিটিশ সরকার বারবার বলেছে, ফকল্যান্ডের মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো আলোচনা হবে না। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদেরও একটি অংশ মনে করেন, দ্বীপবাসীর মতামত উপেক্ষা করে কেবল ঐতিহাসিক দাবির ভিত্তিতে সার্বভৌমত্ব নির্ধারণ করা কঠিন।
বিশ্বকাপে এই ধরনের রাজনৈতিক বার্তা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন আসরে জাতীয় পতাকা, রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা বিতর্কিত ব্যানার নিয়ে ফিফাকে বিব্রত হতে হয়েছে। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকের আগে ফকল্যান্ডকে ঘিরে আর্জেন্টিনার একটি প্রচারণামূলক ভিডিও আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি করেছিল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতীক ও বার্তা নিয়ে ফিফাকে একাধিকবার হস্তক্ষেপ করতে হয়। এসব অভিজ্ঞতার পর ফিফা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে আরও কঠোর নীতি অনুসরণ করছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল ও রাজনীতি বাস্তবে পুরোপুরি আলাদা নয়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই ১৯৮২ সালের যুদ্ধের স্মৃতি এবং দিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের ইতিহাস নতুন করে সামনে চলে আসে। ফলে এই দুই দেশের ম্যাচে আবেগ ও জাতীয়তাবোধ প্রায়ই ফুটবলের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
তবে সাবেক যুদ্ধসেনাদের একটি অংশ ভিন্ন বার্তাও দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড যুদ্ধের কয়েকজন প্রবীণ যোদ্ধা ম্যাচের আগে এক যৌথ বিবৃতিতে সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন ফুটবলকে ঘৃণা বা প্রতিশোধের ভাষায় ব্যবহার না করা হয়। তাঁদের মতে, যুদ্ধের স্মৃতি সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা উচিত, কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনকে নতুন রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চে পরিণত করা উচিত নয়।
এখন নজর ফিফার দিকে। সংস্থাটি যদি মনে করে মাঠে প্রদর্শিত ব্যানারটি রাজনৈতিক বার্তার শামিল, তাহলে জরিমানা বা অন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে অতীতের নজির বলছে, এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত আর্থিক জরিমানা বা সতর্কবার্তার পথেই হেঁটেছে ফিফা; বড় ধরনের ক্রীড়া শাস্তির নজির খুবই বিরল।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের ফাইনালের আগে তাই স্পেন–আর্জেন্টিনা ম্যাচের পাশাপাশি আরেকটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ফকল্যান্ড। একটি ব্যানার আবারও মনে করিয়ে দিল, ইতিহাসের কিছু ক্ষত সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না; সুযোগ পেলেই তা নতুন প্রজন্মের সামনে ফিরে আসে, কখনো রাজনীতির মঞ্চে, কখনো বা ফুটবল মাঠে।
সূত্র: রয়টার্স