কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি শুধু একটি দেশের শাসক ছিলেন না; তাঁকে আধুনিক কাতারের স্থপতিও বলা হয়।
কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি শুধু একটি দেশের শাসক ছিলেন না; তাঁকে আধুনিক কাতারের স্থপতিও বলা হয়। তাঁর শাসনামলেই মরুভূমির ছোট উপসাগরীয় রাষ্ট্রটি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জ্বালানি রপ্তানিকারক, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলোচিত কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রতীক ছিল আল জাজিরা। যে সংবাদমাধ্যম আরব বিশ্বের প্রচলিত সংবাদ উপস্থাপনার ধারা বদলে দেয়। মিডিয়াপ্রেমী এই শাসক গত ১২ জুলাই মারা গেছেন।
১৯৯৫ সালে রক্তপাতহীন ক্ষমতা পরিবর্তনের মাধ্যমে শেখ হামাদ কাতারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তখন দেশটির জনসংখ্যা কম, আন্তর্জাতিক প্রভাবও সীমিত। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু তেল বা গ্যাস দিয়ে বিশ্বে স্থায়ী প্রভাব তৈরি করা সম্ভব নয়। অর্থনীতি, কূটনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা এবং গণমাধ্যম, সব ক্ষেত্রেই কাতারকে দৃশ্যমান করতে হবে। সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আল জাজিরা।
আল জাজিরার জন্ম মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদ পরিবেশনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। সে সময় আরব বিশ্বের অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেল রাষ্ট্রের কড়া নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। বিতর্কিত বিষয়, বিরোধী মত বা সরকারের সমালোচনা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। আল জাজিরা সেই চিত্র পাল্টে দেয়। বিভিন্ন মতের মানুষকে একই পর্দায় এনে বিতর্কের সুযোগ সৃষ্টি করে, যুদ্ধ, মানবাধিকার, রাজনৈতিক সংকট এবং আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ে সরাসরি প্রতিবেদন প্রচার করে। অল্প সময়েই এটি আরব বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমে পরিণত হয়।
এই পরিবর্তন সবাই ইতিবাচকভাবে নেয়নি। অনেক আরব সরকার অভিযোগ করে, আল জাজিরা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করছে। আবার পশ্চিমা বিশ্বের কিছু দেশও বিভিন্ন সময়ে চ্যানেলটির সংবাদ পরিবেশন নিয়ে আপত্তি তোলে। তবু সমর্থকদের মতে, আল জাজিরা আরব অঞ্চলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, জনআলোচনা এবং বিকল্প মত প্রকাশের একটি নতুন পরিসর তৈরি করে।
শেখ হামাদের উত্তরাধিকার শুধু গণমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সময়েই কাতার বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। এই অর্থনৈতিক সাফল্য দেশটিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা এবং কূটনীতিতে বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেয়। একই সময়ে কাতার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও পরিচিতি পায়।
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব স্পষ্ট। তাঁর আমলেই কাতার ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব অর্জন করে। সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও বিশ্বকাপ কাতারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃশ্যমান করে এবং দেশটির অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে।
শেখ হামাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল ২০১৩ সালে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া। উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাসে এমন ঘটনা খুবই বিরল। তিনি তখন বলেছিলেন, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের জন্য পথ ছেড়ে দেওয়াই সময়ের দাবি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কাতারে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়।
সম্প্রতি ৭৪ বছর বয়সে শেখ হামাদের মৃত্যুতে কাতারজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, আধুনিক কাতারের পরিচয়, বৈশ্বিক কূটনীতিতে দেশটির অবস্থান এবং আল জাজিরার আন্তর্জাতিক প্রভাব, সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন শেখ হামাদ। তাঁর উদ্যোগেই ছোট একটি রাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে, যা আজও কাতারের পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), ল্য মঁদ, দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।