রামমূর্তি থেকে মানিলন্ডারিং: কে এই হরিদাস?

নিজস্ব প্রতিবেদক
14 July 2026 12:08 am
কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় ছিলেন হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস

কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় ছিলেন হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় ছিলেন হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস। কেউ তাকে দেখেছেন ধর্মীয় উদ্যোগের উদ্যোক্তা হিসেবে, কেউ আবার প্রশ্ন তুলেছেন বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে। সেই প্রশ্নের মধ্যেই এবার অর্থপাচারের মামলায় তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযোগ, বৈধ আয়ের উৎস না থাকলেও তার ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) হিসাবে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য মিলেছে।

রোববার (১২ জুলাই) গভীর রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর রাধা গোবিন্দ কালী মন্দির এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মানিলন্ডারিং মামলায় আদালতে হাজির করলে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

কী অভিযোগ সিআইডির?

সিআইডির আর্থিক অপরাধ ইউনিটের দাবি, প্রাথমিক অনুসন্ধানে হরিদাসের পাঁচটি ব্যাংক হিসাব ও চারটি এমএফএস অ্যাকাউন্টে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা ও প্রায় সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, তার পরিচিত পেশা ও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এসব লেনদেনের কোনো সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে সম্পৃক্ততারও প্রাথমিক তথ্য মিলেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। তদন্ত এখনো চলমান।

তবে আদালতে হরিদাসের আইনজীবী দাবি করেছেন, মামলার অভিযোগের সঙ্গে মানিলন্ডারিং আইনের উপাদানের মিল নেই। অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে আদালতে হরিদাসের বক্তব্যও উঠে এসেছে। তিনি দাবি করেন, মন্দির পরিচালনা করাই যদি অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে তার কিছু বলার নেই; তদন্তে অনুদানের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা যাচাই করারও আহ্বান জানান তিনি।

অভাবের সংসার থেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস। স্থানীয়দের ভাষ্য, তার বাবা গোপীনাথ তরনীদাস ছিলেন ডালি-কুলোর কারিগর। সীমিত আয়ের পরিবারে বড় হওয়া হরিদাস ২০০৬ সালে স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে তিনি ভারতে যান। সিআইডির দাবি, ২০১০ সালে তিনি অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফেরেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, সেখানে তিনি এসি ও ইলেকট্রনিকস মেরামতের কাজ শিখেছিলেন। দেশে ফিরে উত্তরায় সেই পেশাতেই যুক্ত ছিলেন।

এটি প্রথম গ্রেফতার নয়

হরিদাসের নাম প্রথম বড়ভাবে আলোচনায় আসে ২০২২ সালে। সে সময় র‍্যাব অভিযোগ করেছিল, তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে চাকরি, বদলি ও টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা করতেন। র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পাদিত (এডিটেড) ছবি, ভুয়া পরিচয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করতেন। সেই মামলার তথ্যও বর্তমান তদন্তে বিবেচনায় এসেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

ধর্মান্তর, নতুন পরিচয় ও বিতর্ক

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ২০১৯ সালে হরিদাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘তাওহীদ ইসলাম’ নাম ধারণ করেন। তদন্ত সংস্থার ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে এই পরিচয়ও তিনি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেছেন। তবে এ বিষয়ে তার পরিবারের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং গ্রামের অনেক বাসিন্দাও বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন।

রামমূর্তি নির্মাণে নতুন পরিচিতি

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজ এলাকায় ফিরে এসে হরিদাস পলাশবাড়ীর শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ কালী মন্দিরের সংস্কার ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। দুই একরজুড়ে মন্দির প্রাঙ্গণে নির্মাণ করা হয় শিব ও কৃষ্ণের বিশাল ভাস্কর্য। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৫১ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণমূর্তির উদ্বোধন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার। এরপর শুরু হয় ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের কাজ, যেটিকে ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ রামমূর্তি’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছিল।

তবে প্রকল্পটি ঘিরে স্থানীয়ভাবে বিতর্ক তৈরি হয়। অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। স্থানীয় ইমাম-ওলামাদের একটি অংশ আপত্তি জানিয়ে আন্দোলনে নামে। পরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বার্থে প্রকল্পটি স্থগিতের ঘোষণা দেয় মন্দির কর্তৃপক্ষ।

৪০ কোটি টাকার প্রশ্ন

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে হরিদাস দাবি করেছিলেন, মন্দির সংস্কার ও মূর্তি নির্মাণে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং পুরো অর্থই এসেছে দেশ-বিদেশের ভক্তদের অনুদান থেকে। কিন্তু সেই অর্থের উৎস নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ছিল। সম্প্রতি গাইবান্ধায় মানববন্ধন করে তার সম্পদের উৎস তদন্তেরও দাবি ওঠে। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই সিআইডির তদন্ত সামনে আসে।

এখন নজর তদন্তে

সিআইডির দাবি, ২০২০ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সংঘবদ্ধ হুন্ডি চক্রের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মুদ্রা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি। অন্যদিকে হরিদাসের পক্ষ দাবি করছে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আইনি ভিত্তি দুর্বল।

ধর্মীয় উদ্যোগ, বিতর্কিত পরিচয়, প্রতারণার পুরোনো অভিযোগ এবং এবার মানিলন্ডারিং তদন্ত, সব মিলিয়ে হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিদের একজন। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই মানুষের প্রকৃত পরিচয় ও অর্থের উৎসের রহস্য শেষ পর্যন্ত কতটা উন্মোচিত হবে, তার উত্তর মিলবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই।