শেখ হাসিনায় আটকে গেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
25 August 2026 3:23 pm
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন ঝুলছে শেখ হাসিনা ইস্যুতে।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন ঝুলছে শেখ হাসিনা ইস্যুতে।

ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগোচ্ছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনাকে ঘিরে একটি সংবাদ সম্মেলন সেই প্রক্রিয়ায় নতুন করে ধাক্কা দিয়েছে।

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ওই সংবাদ সম্মেলনে ভিডিও বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সমালোচনা করেন। তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাও বক্তব্য দেন। ঢাকার প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। বাংলাদেশ সরকার বলেছে, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া তারা মেনে নিতে পারে না।

এরপর থেকেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ঢাকা বলছে, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের জন্য একটি “অনুকূল পরিবেশ” দরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত কয়েকজনের প্রত্যর্পণের বিষয়েও নয়াদিল্লির কাছে জবাব চেয়েছে। ভারত বলছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ এখনো তাদের “প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার” মধ্যে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তবে আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুরো সমস্যাটিকে শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বিরোধ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। আসল অচলাবস্থা সম্ভবত অন্য জায়গায়। শেখ হাসিনা কবে বাংলাদেশে ফিরবেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তিনি ভারতে থেকে কী করতে পারবেন।

হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই এখন বড় সমস্যা

বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সাবেক প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদের মতে, প্রত্যর্পণ এবং হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দুটি আলাদা বিষয় হিসেবে দেখা দরকার। তাঁর মতে, বর্তমান অচলাবস্থার বড় কারণ হলো ভারত শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থান করেই রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

প্রত্যর্পণ একটি দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে না দেওয়া তুলনামূলকভাবে ভিন্ন বিষয়। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফর এবং দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রশ্নে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা সম্ভবত এটিই।

এই আপত্তি অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের সময় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও ভারতকে অনুরোধ করেছিলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতীয় মাটি থেকে উত্তেজনামূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান হুমায়ুন কবির আল জাজিরাকে বলেছেন, ঢাকা ভারতের সঙ্গে আস্থা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একটি কার্যকর সম্পর্ক চায়। তবে বাংলাদেশের সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে শেখ হাসিনার মাধ্যমে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির কোনো সুযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে ঢাকা আরও কিছু বাংলাদেশিকে ফেরত চায়, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

তবে ঢাকার অবস্থান থেকে এটাও স্পষ্ট যে, হাসিনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখতে চায় না বাংলাদেশ। হুমায়ুন কবির বলেছেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন। তবে সেটি হতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।

এর মধ্যেই গত সপ্তাহান্তে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে এমন একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল, যাতে মনে হয়েছিল তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রস্তুতি চলছে। পরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি প্রত্যাহার করা হয়। ফলে সফরের সময়সূচি নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়।

শেখ হাসিনাকে কি ভারত প্রত্যর্পণ করবে?

এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন এটিই।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। হাসিনা এই বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বাংলাদেশ প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চায় ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর। দুই দেশের ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে এই অনুরোধ পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের পর বাংলাদেশ আবারও প্রত্যর্পণের দাবি জানায়। ভারত পরে জানায়, বিষয়টি তারা পরীক্ষা করছে।

গত ১১ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তাদের “প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার” মধ্যে পরীক্ষা করা হচ্ছে। অগ্রগতি হলে বাংলাদেশকে জানানো হবে।

ভারতে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, প্রত্যর্পণের বিষয়টি দুই দেশের চুক্তি এবং ভারতের আইনি ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। তাঁর মতে, প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় সব আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আদালতের আদেশ নিতে হবে। চুক্তিতে এমন কিছু কারণও রয়েছে, যার ভিত্তিতে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।

অর্থাৎ ঢাকার রাজনৈতিক দাবি যতই জোরালো হোক, নয়াদিল্লির জন্য বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নয়। এর সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়াও জড়িত।

ঢাকার ভেতরেও কি রয়েছে রাজনৈতিক হিসাব?

এখানেই বিষয়টি আরও জটিল।

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার মধ্যে রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে। তাঁর মতে, ঢাকা হয়তো জানে ভারত সহজে হাসিনাকে ফেরত দেবে না। ফলে এই দাবি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জনমতের কাছেও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এর পাশাপাশি হাসিনা দেশে ফিরে এলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জন্যও নতুন ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। তিনি একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। তাঁকে দেশে এনে কীভাবে বিচারিক ও রাজনৈতিকভাবে সামলানো হবে, সেটি হবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।

তবে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধের বাইরে বাংলাদেশের ভারতনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, ঢাকার বর্তমান অবস্থানকে শুধু ভারতবিরোধী হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মানুষের যোগাযোগের গুরুত্ব এখনো অনেক বেশি।

তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের বাস্তবতা বদলে গেছে। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা ভারতের নীতিনির্ধারকদেরও এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে সময় লেগেছে। এখন দিল্লি সেই নতুন বাস্তবতা মেনে নেওয়ার দিকে এগোলেও ঢাকা তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাইছে।

সম্পর্ক ভাঙতে চায় না কেউই

রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও দুই দেশের বাস্তব যোগাযোগ বন্ধ হয়নি।

চলতি মাসেই কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণও বছরে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ভারতের হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১০ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।

ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর ভাষায়, ভূগোলই দুই দেশকে একে অপরের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। দুই দেশের প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত। ফলে দীর্ঘ সময় একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কহীন থাকা বাস্তবে কোনো পক্ষের জন্যই সহজ নয়।

তবে চক্রবর্তী মনে করেন, কোনো একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ ও দুই দেশের সম্পর্ক আটকে রাখা উচিত নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, জাতীয় স্বার্থ ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এসব পদক্ষেপ দিল্লির উদ্বেগের কারণ হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও কৌশলগত ক্ষেত্রে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা ভারতের হিসাবকে আরও জটিল করছে।

তারপরও ভারত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের জন্যও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে ৭০টির বেশি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামো রয়েছে। ফলে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার বাস্তব সুযোগ কোনো পক্ষেরই নেই।

এই কারণেই ১৮ আগস্ট ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণ এখনো বহাল আছে। দিল্লি বলেছে, তারা পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে “ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী” সম্পর্ক চায়।

এর বাইরে সাম্প্রতিক রয়টার্সের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফরের তারিখ এখনো নিশ্চিত হয়নি। ঢাকা ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতে অবস্থানরত অন্য অভিযুক্তদের বিষয়ে জবাবের অপেক্ষায় আছে। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।

সব মিলিয়ে এখন প্রশ্নটি শুধু শেখ হাসিনাকে ভারত ফেরত দেবে কি না, তা নয়। বরং আরও বাস্তব একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। শেখ হাসিনা ভারতে থাকবেন, নাকি থাকলেও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর কোনো সীমা আসবে?

এই প্রশ্নের একটি গ্রহণযোগ্য উত্তর মিললে হয়তো ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে বরফ গলতে শুরু করতে পারে। কারণ বাস্তবতা হলো, কোনো পক্ষই দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকতে পারবে না। এখন প্রয়োজন এমন একটি সমঝোতা, যাতে ভারতকে প্রকাশ্যে পিছু হটতে না হয়, আবার বাংলাদেশও মনে না করে যে তার জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।

মূল আল জাজিরা প্রতিবেদনটি পড়ুন