১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার সকাল। ঢাকার নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় মাত্র ২৫ বছর বয়সী এক তরুণ জনপ্রিয় নায়কের নিথর দেহ। নাম সালমান শাহ, যাঁর পারিবারিক নাম ছিল চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। সিলেটের জকিগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই তরুণ তখন পুরো বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠেছিলেন এক নাম, রাজপুত্র, নায়কদের নায়ক, স্বপ্নের নায়ক।
সেই সকালেই বদলে যায় ঢালিউডের ইতিহাস। প্রায় তিন দশক পার হয়ে গেলেও সেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক থামেনি। আর সম্প্রতি সেই পুরোনো মামলাতেই এসেছে এক নাটকীয় মোড়, দীর্ঘদিন পলাতক থাকা অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিমানবন্দর থেকে, ওমরাহ করতে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই।
মাত্র সাড়ে তিন বছরে যিনি হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি
সালমান শাহর ক্যারিয়ার দৈর্ঘ্যে ছোট হলেও প্রভাবে ছিল সুবিশাল। ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে তাঁর অভিষেক, আর সেই ছবিই রাতারাতি তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। এরপর মাত্র সাড়ে তিন থেকে সাড়ে পাঁচ বছরের অভিনয়জীবনে তিনি উপহার দেন ২৭টি চলচ্চিত্র, যার অধিকাংশই ছিল ব্যবসাসফল। জনপ্রিয়তা তার এমনই ছিল যে, সেকালে অন্য নায়কদের ছবি চলতই না। অথচ সালমান শাহর হাতে কাজের পর কাজ।
মৌসুমীর সঙ্গে প্রথম ছবিতে জুটি বাঁধলেও পরবর্তীতে শাবনূরের সঙ্গে তাঁর জুটি হয়ে ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি অধ্যায়ের অন্যতম প্রতীক। এ ছাড়া শাবনাজ, শাহনাজ, লিমা, শিল্পী, শ্যামা, সোনিয়া, বৃষ্টি, সাবরিনা ও কাঞ্চির সঙ্গেও তিনি পর্দা ভাগ করেছেন। ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘প্রেমযুদ্ধ’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘আনন্দ অশ্রু’র মতো ছবিগুলো এখনো দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন।
শুধু অভিনয় নয়, স্টাইল ও ফ্যাশন সচেতনতাতেও তিনি এক নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন। অভিনয়শিল্পী শাকিব খানের ভাষায়, সালমান শাহর আবির্ভাবের পর একটি পুরো প্রজন্ম অভিনয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে; তাঁর ছোঁয়ায় বাংলা চলচ্চিত্রে এক ধরনের বিপ্লব ঘটে। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর জনপ্রিয়তা এখনো অনেকটাই অটুট, নতুন প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যেও তাঁর সিনেমা, গান আর ছবির প্রতি আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।
যে শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি
সালমান শাহর আকস্মিক মৃত্যু ঢালিউডে যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা আজও আলোচনার বিষয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু, তাঁর মৃত্যুর পর দর্শক-হলমুখী সেই জোয়ার অনেকটাই থিতিয়ে যায় বলে মনে করেন অনেক চলচ্চিত্র বিশ্লেষক ও তাঁর সমসাময়িক শিল্পীরা। তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা তারকা-সংস্কৃতি, তাঁর অনুকরণে তরুণদের পোশাক-চুলের স্টাইল, এমনকি চলচ্চিত্রে নতুন করে দর্শক টানার যে গতি তৈরি হয়েছিল, তা তাঁর মৃত্যুর পর আর সেভাবে ফেরেনি।
মামলার দীর্ঘ আইনি লড়াই
সালমান শাহর মৃত্যুর পরপরই তাঁর বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা দাযের করেন। কিন্তু পরিবারের দাবি ছিল শুরু থেকেই, এটি অপমৃত্যু নয়, হত্যাকাণ্ড। মা নীলা চৌধুরীর অভিযোগ, হত্যা মামলা করতে চাইলেও পুলিশ সেটিকে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে।
এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন দশক। একের পর এক তদন্ত হয়েছে, মেলেনি বিচার।
১৯৯৭ সালে সিআইডির প্রতিবেদনে মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলা হয়।
২০০৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ আসে, প্রতিবেদন জমা পড়ে ২০১৪ সালে, সেখানেও বলা হয় ‘অপমৃত্যু’।
২০১৬ সালে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত। ২০২০ সালে পিবিআই প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন, যার পেছনে পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়।
নীলা চৌধুরী এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন, অভিযোগ করেন আসামিপক্ষের প্রভাবে তদন্ত প্রভাবিত হয়েছে।
দীর্ঘ এই আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে গত বছর, ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত হত্যা মামলা রুজুর নির্দেশ দেন। এর ভিত্তিতে সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন, যেখানে আসামি করা হয় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে। মামলাটি এখন আবার তদন্ত করছে সিআইডি।
ডনের গ্রেপ্তার: নতুন মোড়
এই মামলার ৪ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন (৫৪)। দীর্ঘদিন পলাতক থাকা এই অভিনেতাকে গত রোববার (৯ আগস্ট) ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়, যখন তিনি ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য ইমিগ্রেশনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিচ্ছিলেন। পরে তাঁকে মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির হাতে হস্তান্তর করা হয়।
আদালতে তাঁকে হাজির করে তদন্ত কর্মকর্তা কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বরাত অনুযায়ী, মামলার এক সময়কার আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ আগেই স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন যে সামিরা হকের সঙ্গে ডনের অবৈধ সম্পর্ক ছিল, আর ডন, ফারুক ও রেজভি মিলে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা করেন, প্রথমে অচেতন করে পরে আত্মহত্যা সাজিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। শুনানি শেষে বিচারক ডনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন, কারণ পালিয়ে যাওয়া বা তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল বলে আদালতে জানানো হয়।
সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ
মৃত্যুর আগের দিন, ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সালমান শাহ ‘প্রেমপিয়াসী’ ছবির ডাবিংয়ের জন্য এফডিসিতে যান, যেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন নায়িকা শাবনূর। পরিবারের ভাষ্য ও তৎকালীন কয়েকটি বিনোদন সাময়িকীর বরাতে জানা যায়, সেদিন এফডিসিতেই উপস্থিত ছিলেন সালমান পত্নী সামিরা। ডাবিং রুমে তিনি সালমান-শাবনূরের খুনসুটি দেখে ক্ষুব্ধ হন। এরপর ফেরার পথে গাড়িতে সালমানের সঙ্গে কোনো কথাও বলেননি সামিরা। রাত ১১টার দিকে পরিচালক বাদল খন্দকার সালমানকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে চলে যান। পরদিন সকালে শিডিউল নিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, রাতেই সালমান শাহ মারা গেছেন।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ঘটনার দিন সকালে তাঁর স্বামী ছেলের বাসায় গেলে দারোয়ান বাধা দেন, পরে জোর করে ওপরে ওঠেন। দরজা খোলেন সামিরা, জানান সালমান ঘুমাচ্ছেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর একটি ফোনকল আসে বাসায়, তখনই ছুটে যান নীলা চৌধুরী, দেখেন ছেলের হাত-পায়ের নখ নীল হয়ে গেছে।
ডনকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা
আশরাফুল হক ওরফে ডন মূলত পর্দার খলচরিত্রের অভিনেতা হিসেবে পরিচিত হলেও সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর নাম নানা সময়ে গণমাধ্যম ও পারিবারিক অভিযোগে ঘুরেফিরে এসেছে। মামলার অন্য আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদের ১৯৯৭ সালের এক পুরোনো মামলার স্বীকারোক্তি থেকেই মূলত ডনের নাম হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে যায়, সেই মামলাটি ছিল সালমান শাহর ছোট ভাইকে অপহরণচেষ্টার ঘটনায়। বছরের পর বছর ধরে গণমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পারিবারিক বিবৃতিতে ডনের নাম আলোচিত হলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। মামলার আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি মূলত শুরু হয় গত বছর হত্যা মামলা রুজুর পর থেকেই, আর এবার তাঁর গ্রেপ্তার সেই দীর্ঘ আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া
ডনের গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সালমান শাহর মামা মামলার বাদী আলমগীর কুমকুম। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং তাঁরা চান সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে রহস্য উন্মোচিত হোক, দোষীদের শাস্তি হোক।
লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যে, বর্তমান সরকারের সময়ে যা অগ্রগতি হয়েছে তা আগে কখনো হয়নি। তিনি বলেন, ডন এই ঘটনায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত, আর তাঁর মাধ্যমে বাকি সব তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশাবাদী। এখনো মূল আসামি হিসেবে সামিরা ও তাঁর মা লুসিকে গণ্য করে বিচার দাবি করেছেন তিনি।
যা এখন দেখার
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, সালমান শাহ হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে, পাশাপাশি পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারেরও চেষ্টা করা হচ্ছে। ডনকে ঘিরে জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া চলমান, তাঁর জবানবন্দি এই মামলার ভবিষ্যৎ মোড় অনেকখানি নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় তিন দশক ধরে ঝুলে থাকা এই রহস্যের জট শেষ পর্যন্ত খোলে কি না, তা এখন দেখার অপেক্ষা।