ফ্রান্স জার্মানি ইতালির কোচ হচ্ছেন যারা

ক্রীড়া প্রতিবেদক
21 July 2026 11:43 pm
২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল শক্তিগুলো নিজেদের বেঞ্চে বসাতে চাইছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কোচদের।

২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল শক্তিগুলো নিজেদের বেঞ্চে বসাতে চাইছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কোচদের।

২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হতেই ইউরোপীয় ফুটবলে শুরু হয়েছে আরেকটি উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই, কোচিং ডাগআউটের লড়াই। মাঠে ট্রফির যুদ্ধ শেষ হলেও এখন শুরু হয়েছে জাতীয় দলগুলোর নতুন চক্রের প্রস্তুতি। ২০৩০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল শক্তিগুলো নিজেদের বেঞ্চে বসাতে চাইছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কোচদের। ফ্রান্সে জিনেদিন জিদানের আগমন কার্যত নিশ্চিত, জার্মানি ইয়ুর্গেন ক্লপকে নিয়ে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আর ইতালিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আজ্জুরিদের ডাগআউটে কি শেষ পর্যন্ত বসবেন পেপ গার্দিওলা?

বিশ্বকাপে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার পর ইউরোপের কয়েকটি বড় ফুটবল শক্তি বুঝে গেছে, আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে শুধু প্রতিভাবান ফুটবলার থাকলেই হয় না; প্রয়োজন এমন একজন কোচ, যিনি একই সঙ্গে কৌশলী, অনুপ্রেরণাদাতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকারী। তাই ক্লাব ফুটবলের কিংবদন্তি কোচদের জাতীয় দলের বেঞ্চে আনার প্রতিযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র।

ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশন বহুদিন ধরেই দিদিয়ে দেশমের উত্তরসূরি হিসেবে জিনেদিন জিদানকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী এই কিংবদন্তি ফুটবলার রিয়াল মাদ্রিদে তিনটি টানা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে নিজেকে আধুনিক যুগের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর পাশাপাশি ইউরোপের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বকাপ শেষে ফ্রান্সের নতুন যুগ শুরু হবে জিদানের হাত ধরেই।

জার্মানিতেও একই ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া। বিশ্বকাপে হতাশাজনক বিদায়ের পর জুলিয়ান নাগেলসমানের অধ্যায় শেষ হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন লিভারপুল ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের সাবেক সফল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ। জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফবি) এবং ক্লপের মধ্যে চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোতে সমঝোতা হয়েছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত মেয়াদের চুক্তিতে তিনি জাতীয় দলের দায়িত্ব নেবেন।

এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে ইতালি। ২০০৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টানা তিনটি বিশ্বকাপে হতাশার মুখ দেখার পর নতুন করে নিজেদের পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। ইতালীয় সংবাদমাধ্যম ও জার্মান স্কাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন পেপ গার্দিওলাকে জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সক্রিয় আলোচনা করছে। এমনকি সাবেক তারকা পাওলো মালদিনি ও উপদেষ্টা লিওনার্দো বার্সেলোনায় গিয়ে গার্দিওলার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে নিশ্চিত করেনি।

গার্দিওলার নাম ইতালির সঙ্গে জড়ানোর পেছনে শুধু তাঁর সাফল্য নয়, তাঁর ফুটবল দর্শনও বড় কারণ। বার্সেলোনায় ‘টিকি-টাকা’, বায়ার্ন মিউনিখে কৌশলগত আধিপত্য এবং ম্যানচেস্টার সিটিতে ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইতালির অনেক বিশ্লেষকের মতে, আজ্জুরিদের প্রতিভাবান তরুণদের নিয়ে নতুন যুগ গড়তে এমন একজন কৌশলবিদই প্রয়োজন।

সাবেক ইতালীয় ডিফেন্ডার ফাবিও কানাভারো সম্প্রতি বলেছেন, ইতালির সবচেয়ে বড় সংকট এখন প্রতিভার নয়, পরিচয়ের। তাঁর মতে, দলকে এমন একজন কোচ দরকার, যিনি খেলোয়াড়দের আবার একটি সুস্পষ্ট ফুটবল দর্শনের অধীনে একত্র করতে পারবেন। অন্যদিকে ইতালীয় গণমাধ্যমে পাওলো মালদিনিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মানের একজন কোচকে আনার সুযোগ তৈরি হলে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করা ক্লাব ফুটবলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রতিদিন অনুশীলনের সুযোগ নেই, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সময়ও সীমিত। ফলে ক্লপ, জিদান কিংবা গার্দিওলার মতো ব্যক্তিত্বরা তাঁদের কৌশল আন্তর্জাতিক ফুটবলে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন, সেটিও হবে বড় প্রশ্ন।

ফুটবল বিশ্লেষকদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, ইউরোপের বড় ফুটবল শক্তিগুলো এখন শুধু ভালো কোচ নয়, ‘জাতীয় আইকন’ও খুঁজছে। জিদান ফ্রান্সের প্রতীক, ক্লপ জার্মান ফুটবলের আবেগ, আর গার্দিওলা আধুনিক কোচিংয়ের বিশ্বমান। মাঠের ফলাফলের পাশাপাশি এই নিয়োগগুলো সমর্থকদের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনে।

তবে ইতালির ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। গার্দিওলার সঙ্গে যোগাযোগের খবর প্রকাশ পেলেও তিনি দায়িত্ব নেবেন কি না, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে আজ্জুরিদের বেঞ্চে শেষ পর্যন্ত গার্দিওলাই বসবেন, নাকি অন্য কোনো ইতালীয় কোচকে বেছে নেওয়া হবে, সেই উত্তর এখনও সময়ের হাতেই।

যদি সত্যিই ফ্রান্সে জিদান, জার্মানিতে ক্লপ এবং ইতালিতে গার্দিওলা, এই তিন কিংবদন্তি একই সময়ে জাতীয় দলের কোচ হন, তবে ২০৩০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির লড়াই শুরু হবে ডাগআউট থেকেই। মাঠের বাইরের এই প্রতিযোগিতা হয়তো পরবর্তী বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্পগুলোর একটি হয়ে উঠবে।

সূত্র: এএনএসএ, লা একিপ, দ্য গার্ডিয়ান, বুন্দেসলিগা, ইউরোনিউজ, স্কাই জার্মানি, বিবিসি, রয়টার্স।