ভারতে নির্বাসনে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। তবে তাঁর এই ঘোষণার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে একাধিক প্রশ্ন: ভারত কি তাঁকে ফিরতে দেবে? দেশে ফিরলে কী হবে? মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে তিনি আদৌ বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন কি? আর বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের ভবিষ্যৎই বা কী?
এদিকে বাংলাদেশ সরকারের তরফে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধের বিষয়টি আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে বিবেচনা করার কথা বলেছে ভারত। শুক্রবারই নয়া দিল্লিতে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন।
শুক্রবার নয়া দিল্লিতে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে যান। এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন বলে ভারত ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রায় এক বছর পার হলেও তাঁকে কোনো জনসভা, সংবাদ সম্মেলন বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
যদিও প্রকাশ্যে আসেননি, তবু মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়েছেন। অনলাইন বক্তব্যে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এসব বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের মাটিতে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত থাকার পেছনে নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে ভারত সরকার বা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, আগামী ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। তাঁর দাবি, শুধু তিনি নন, নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও তাঁর সঙ্গে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন।
তবে এই ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। পাশাপাশি আরও একাধিক মামলা বিচারাধীন। এ অবস্থায় দেশে ফিরলে তাঁকে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার করে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিষয়টি দেশটির আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আলোকে বিবেচনাধীন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও মধ্যম সারির বেশ কয়েকজন নেতা দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন।
শেখ হাসিনা রয়েছেন ভারতে। তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। শেখ রেহানা অবস্থান করছেন যুক্তরাজ্যে।
এ ছাড়া দলটির কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতা ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কানাডা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে তাঁদের সবার অবস্থান সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
তাঁরা ফিরলে কী হবে?
আইনজ্ঞদের মতে, যেসব নেতার বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি কিংবা অন্য ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে, তাঁরা দেশে ফিরলে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার হতে পারেন। এরপর তাঁদের আদালতে হাজির করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চলবে।
অন্যদিকে, যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে দেশে ফেরার ওপর আইনগত কোনো বাধা নেই। তবে প্রত্যেকের পরিস্থিতি তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলা ও আদালতের আদেশের ওপর নির্ভর করবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন প্রত্যর্পণ
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানো হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ভারত বলছে, প্রত্যর্পণের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এটি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া ও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের ভবিষ্যতের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অন্য অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কী হবে?
ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। তবে তাঁর দেশে ফেরা এখন আর শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, প্রত্যর্পণ চুক্তি, বিচারিক প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
তিনি ঘোষিত সময়ে সত্যিই দেশে ফিরবেন কি না, ভারত তাঁকে ফেরার অনুমতি দেবে কি না, কিংবা দেশে ফিরলে মৃত্যুদণ্ডের রায়সহ বিভিন্ন মামলার মুখোমুখি কীভাবে হবেন, এসব প্রশ্নের উত্তর আপাতত সময়ের হাতেই রয়ে গেছে।