আইফোনের একটি ফিচার যেভাবে ব্যর্থ করেছিল তুরস্কের অভ্যুত্থান

লুৎফর রহমান হিমেল
16 July 2026 4:18 pm
সেই রাতে ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান নয়, ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল একটি স্মার্টফোনের পর্দা। আইফোনের ফেসটাইম ভিডিও কল।

সেই রাতে ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান নয়, ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল একটি স্মার্টফোনের পর্দা। আইফোনের ফেসটাইম ভিডিও কল।

আজ থেকে দশ বছর আগের একদিন। রাত তখন গভীর। আঙ্কারা আর ইস্তানবুলের আকাশে নিচু দিয়ে ছুটে যাচ্ছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। রাস্তায় ট্যাংক, চারদিকে গুলির শব্দ। বসফরাস সেতু বন্ধ করে দিয়েছে সশস্ত্র সেনারা। প্রেসিডেন্ট ভবন, পুলিশ সদর দপ্তর, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংসদ ভবন হামলার মুখে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সামরিক বাহিনীর নামে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে: তুরস্কের ক্ষমতা সেনাবাহিনী দখল করেছে।

দেশটির ইতিহাসে সামরিক অভ্যুত্থান নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু ২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের রাতটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ, সেই রাতে ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান নয়, ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল একটি স্মার্টফোনের পর্দা। আইফোনের ফেসটাইম ভিডিও কল।

মাত্র কয়েক মিনিটের একটি ফেসটাইম ভিডিও কল, যা সম্প্রচার করেছিল সিএনএন তুর্ক, সেই ভিডিও কল শুধু একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের গল্পই লেখেনি; বরং গত এক দশকে তুরস্কের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, সামরিক কাঠামো, গণমাধ্যম এবং পররাষ্ট্রনীতির গতিপথও আমূলে বদলে দিয়েছে।

যখন মনে হচ্ছিল, সরকার পড়ে গেছে

অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোয়ান হয়তো গ্রেপ্তার হয়েছেন কিংবা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। গুঞ্জন ডালপালা মেলে একাকার! সেই সময় এরদোয়ান মারমারিসে অবকাশ যাপন করছিলেন। অভ্যুত্থানকারীরা বিমানবন্দর, সেতু, সামরিক ঘাঁটি, টেলিভিশন কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিল।

দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে গুজব। কেউ জানে না, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে।

ঠিক তখনই ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

ফেসটাইমের সেই কল

গভীর রাতে সিএনএন তুর্কের উপস্থাপক হান্দে ফিরাতের মোবাইল ফোনে ফেসটাইমে যুক্ত হন খোদ প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।

কোনো স্টুডিও নয়। কোনো রাষ্ট্রীয় ভাষণ নয়।

একটি মোবাইল ফোনের ছোট্ট পর্দায় দেখা যায় প্রেসিডেন্টকে।

হান্দে ফিরাত নিজের ফোনটি ক্যামেরার সামনে ধরে রাখেন। কোটি কোটি দর্শক সরাসরি দেখেন এরদোয়ানকে।

এরদোয়ান আহ্ববান রাখেন, জনগণ যেন কেউ ঘরে না থাকে। সবাইকে বিমানবন্দর, সেতু এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ চত্বরে নেমে এসে নির্বাচিত সরকারকে রক্ষা করতে হবে।

এই কয়েক মিনিটের ভিডিও কল পরবর্তীকালে রাজনৈতিক যোগাযোগের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, সেই মুহূর্তে জনগণ প্রথমবার নিশ্চিত হয়, রাষ্ট্রপ্রধান জীবিত আছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আত্মসমর্পণ করেননি।

প্রযুক্তি বনাম ট্যাংক

অভ্যুত্থানকারীরা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দখল করতে পেরেছিল। কিন্তু তারা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং বেসরকারি সম্প্রচারমাধ্যমকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।

রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেসটাইমের সেই কল ছিল “ডিজিটাল যুগের প্রথম বড় রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণ।”

সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে সেদিন প্রযুক্তি, গণমাধ্যম এবং জনসমর্থন একসঙ্গে কাজ করেছিল।

এরদোয়ানের আহ্বানের কিছুক্ষণের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন মসজিদ থেকেও লাউডস্পিকারে মানুষকে রাস্তায় নামার ডাক দেওয়া হয়।

হাজার হাজার মানুষ ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে যায়।

বসফরাস সেতুতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেনাদের সংঘর্ষ শুরু হয়।

অনেক জায়গায় মানুষ খালি হাতে ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।

কয়েক ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায় অভ্যুত্থান

ভোর হওয়ার আগেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

অভ্যুত্থানকারীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, সেনাবাহিনীর বড় অংশের সমর্থন না পাওয়া, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও অভ্যুত্থানের বিরোধিতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ, সব মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২৫৩ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ১৮৪ জন ছিলেন সাধারণ নাগরিক। নিহত হন অভ্যুত্থানে জড়িত কয়েক ডজন সেনাসদস্যও।

তুরস্কের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান।

এরপর শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শুদ্ধি অভিযান

অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর সরকার অভিযোগ তোলে, পুরো ষড়যন্ত্রের পেছনে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইসলামি ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেন।

গুলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে তুরস্কে শুরু হয় নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান।

জরুরি অবস্থা জারি করা হয় প্রায় দুই বছরের জন্য।

এক লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত হন।

হাজার হাজার সেনা কর্মকর্তা, বিচারক, প্রসিকিউটর, পুলিশ সদস্য, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সরকারি কর্মচারী গ্রেপ্তার বা চাকরি হারান।

শত শত স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সরকারের ভাষ্য ছিল, রাষ্ট্রের ভেতরে গড়ে ওঠা “সমান্তরাল কাঠামো” ধ্বংস করতেই এই অভিযান প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ফ্রিডম হাউজ এবং ইউরোপীয় বিভিন্ন সংস্থা অভিযোগ তোলে, এই অভিযান ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিরোধী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

এরদোয়ানের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা

২০১৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে তুরস্ক সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় চলে যায়।

প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত হয়।

প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা আরও বাড়ে।

সরকারের মতে, এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হয়েছে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে।

সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

ফ্রিডম হাউজের মূল্যায়নে, আইনসভা ও বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

গণমাধ্যম ও বিরোধী রাজনীতির নতুন বাস্তবতা

গত এক দশকে তুরস্কে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের সাম্প্রতিক সূচকে দেশটির অবস্থান নিচের দিকেই রয়েছে।

বিরোধী নেতা, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং জনপ্রিয় সামাজিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধেও একের পর এক মামলা হয়েছে।

২০২৫ সালে ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুর গ্রেপ্তার এবং ২০২৬ সালে বিরোধী দল সিএইচপির নেতৃত্ব নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

সরকার অবশ্য বরাবরই বলে আসছে, এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নয়; আইনের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে।

সেনাবাহিনীর যুগের অবসান?

তুরস্কে কয়েক দশক ধরে সেনাবাহিনী নিজেদের প্রজাতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে দেখত।

১৯৬০, ১৯৭১, ১৯৮০ এবং ১৯৯৭ সালে বিভিন্নভাবে তারা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছিল।

কিন্তু ২০১৬ সালের পর সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক সংস্কার আনা হয়।

সামরিক একাডেমি পুনর্গঠন করা হয়।

কমান্ড কাঠামো পরিবর্তন হয়।

বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা হয়।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এর মধ্য দিয়েই তুরস্কে সামরিক অভিভাবকত্বের যুগ কার্যত শেষ হয়ে যায়।

বদলে যায় পররাষ্ট্রনীতিও

অভ্যুত্থানের পর আঙ্কারা আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে।

উত্তর সিরিয়ায় একাধিক সামরিক অভিযান চালানো হয়।

ন্যাটোর সদস্য হয়েও তুরস্ক রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয় এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে তুরস্ককে বাদ দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

ইতিহাসে কেন অমর হয়ে থাকবে সেই ভিডিও কল

২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের রাতটি শুধু একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস নয়।

এটি এমন এক রাত, যখন একটি মোবাইল ফোনের ছোট্ট পর্দা ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং অস্ত্রধারী সেনাদের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলেছিল।

সিএনএন তুর্কে প্রচারিত আইফোনের ফেসটাইমের সেই ভিডিও কল আজও রাজনৈতিক যোগাযোগের ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

এক দশক পরও সেই রাত নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। সরকারের কাছে এটি গণতন্ত্র রক্ষার বিজয়; সমালোচকদের কাছে এটি এমন এক মোড়, যার পর তুরস্ক আরও কেন্দ্রীভূত ও কঠোর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত, ফেসটাইমের সেই কল না হলে, তুরস্কের ইতিহাস হয়তো আজ সম্পূর্ণ অন্যরকম লেখা হতো।

(এই ফিচার কনটেন্টে বিবিসি, বিবিসি টার্কিশ, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), আল জাজিরা, সিএনএন, সিএনএন টার্ক, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, ডয়চে ভেলে (ডিডব্লিউ), ফ্রান্স টোয়েন্টিফোর, পলিটিকো ইউরোপ, নিক্কেই এশিয়া, ফ্রিডম হাউজ, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ন্যাটো, ইউরোপীয় কমিশন, তুরস্কের প্রেসিডেন্সি কমিউনিকেশনস ডিরেক্টরেট এর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।)