থাইল্যান্ডে মিলল দুই হাজার বছরের পুরোনো ভারতীয় লিপি খোদাই সোনার আংটি

প্রিয়দেশ ডেস্ক
17 July 2026 12:33 pm
আংটির মালিক সম্ভবত প্রাচীন ভারতের বৈশ্য সম্প্রদায়ের একজন বণিক ছিলেন।

আংটির মালিক সম্ভবত প্রাচীন ভারতের বৈশ্য সম্প্রদায়ের একজন বণিক ছিলেন।

থাইল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলে চলমান প্রত্নতাত্ত্বিক খননে উদ্ধার হয়েছে প্রায় দুই হাজার বছর আগের দুটি সোনার আংটি। আংটিগুলো পাওয়া গেছে একটি মানব কঙ্কালের পাশ থেকে। এর একটি আংটিতে খোদাই করা রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় লিপি। গবেষকদের ধারণা, এই আবিষ্কার শুধু একটি প্রাচীন সমাধির রহস্যই উন্মোচন করছে না, বরং প্রায় দুই হাজার বছর আগে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ কতটা গভীর ছিল, তারও নতুন প্রমাণ দিচ্ছে।

থাইল্যান্ড সরকারের চারুকলা বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির ফেতচাবুরি প্রদেশের ডন ইয়াই থং প্রত্নস্থলে গত সপ্তাহে খননকাজ চলাকালে এই দুটি আংটি উদ্ধার করা হয়। একই স্থানে একটি মানব কঙ্কালও পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি আংটি সম্পূর্ণ সাধারণ নকশার, আর অন্যটিতে খোদাই করা রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় ব্রাহ্মী লিপি।

বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আংটির লেখাটি পড়া যায় ‘পুসারাখিতাসা’। এর অর্থ, ‘পুষ্য নক্ষত্রের সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তি’। ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা ও প্রাচীন বিশ্বাসে পুষ্যকে অত্যন্ত শুভ নক্ষত্র হিসেবে গণ্য করা হয়।

গবেষকদের ধারণা, আংটির মালিক সম্ভবত প্রাচীন ভারতের বৈশ্য সম্প্রদায়ের একজন বণিক ছিলেন। সে সময় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্য করতেন। ফলে এই আংটিগুলো শুধু ব্যক্তিগত অলংকার নয়, প্রাচীন বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে।

ডন ইয়াই থং প্রত্নস্থলটি এ বছরের শুরুতে আবিষ্কৃত হয়। একটি ধানক্ষেতে প্রাচীন ব্রোঞ্জের ঢাকের ভাঙা অংশ খুঁজে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। এরপর প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেখানে খনন শুরু করলে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বেরিয়ে আসতে থাকে।

প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এই এলাকা থাইল্যান্ডের প্রাগৈতিহাসিক যুগের শেষ পর্যায়ের বসতি। ধারণা করা হচ্ছে, এর বয়স প্রায় দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার বছর। ইতিহাসে এই সময়কে সাধারণভাবে লোহযুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে অন্তত আটটি মানব কঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে। পাশাপাশি মিলেছে সোনা ও ব্রোঞ্জের অলংকার, কাচ ও পাথরের পুঁতি, মাটির তৈরি পাত্রসহ নানা প্রত্নবস্তু। এসব নিদর্শন দেখে গবেষকদের ধারণা, এটি সাধারণ মানুষের কবরস্থান ছিল না। বরং সমাজের উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক সমাধিক্ষেত্র ছিল।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ব্রাহ্মী লিপি খোদাই করা আংটির আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, সেই সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় সভ্যতার প্রভাব শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ছিল না; বাণিজ্যিক যোগাযোগও ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। ভারত মহাসাগর ঘিরে গড়ে ওঠা প্রাচীন সমুদ্রপথের মাধ্যমে মানুষ, পণ্য, ভাষা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটত বলেই মনে করছেন গবেষকেরা।

থাইল্যান্ডের চারুকলা বিভাগ জানিয়েছে, খননকাজ শেষ হতে আরও প্রায় এক মাস লাগবে। এরপর উদ্ধার হওয়া প্রত্নবস্তু সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জন্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন উদ্ধার হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য জানা যাবে।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এবিসি নিউজ, সিবিএস নিউজ, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, পিপল।