রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টা ব্যবস্থা তৈরি করছে ইউরোপ জোট

প্রিয়দেশ ডেস্ক
15 July 2026 3:40 pm
রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় নিজস্ব উচ্চস্তরের মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে ইউরোপ। নতুন এই উদ্যোগের লক্ষ্য বায়ুমণ্ডলের বাইরেই শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার সক্ষমতা অর্জন।

রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় নিজস্ব উচ্চস্তরের মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে ইউরোপ। নতুন এই উদ্যোগের লক্ষ্য বায়ুমণ্ডলের বাইরেই শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার সক্ষমতা অর্জন।

ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে শুধু সামরিক ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করেনি, বদলে দিয়েছে মহাদেশটির নিরাপত্তা ভাবনাও। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিজ্ঞতা ইউরোপীয় দেশগুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছে বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই এবার ইউরোপ নিজেদের প্রথম স্বতন্ত্র উচ্চস্তরের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পথে হাঁটছে।

নতুন উদ্যোগটির নাম ব্লিকসেম এক্সো। এটি কোনো একক দেশের প্রকল্প নয়; বরং ইউরোপের শীর্ষ প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগ। এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস, থ্যালেস, এমবিডিএ ডয়েচল্যান্ড, সাফরান এবং ডাচ মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডেস্টিনাস ইতোমধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। তাদের লক্ষ্য, এমন একটি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করা, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে উড়ে যাওয়া মাঝারি ও মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝপথেই ধ্বংস করতে পারবে।

বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্যাট্রিয়ট, আইরিস-টি, নাসামস ও স্যাম্প/টি-এর মতো অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও এগুলোর বেশিরভাগই বায়ুমণ্ডলের ভেতরে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের জন্য তৈরি। কিন্তু রাশিয়ার আধুনিক ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ উড্ডয়নের মাঝামাঝি সময়ে বায়ুমণ্ডলের বাইরে চলে যায়। এই পর্যায়ে সেগুলোকে ধ্বংস করার সক্ষমতা ইউরোপের নিজস্বভাবে নেই। এই ঘাটতি পূরণ করতেই নতুন প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ এই সিদ্ধান্তের প্রধান অনুপ্রেরণা। গত কয়েক বছরে রাশিয়া বারবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কিনঝাল এবং ওরেশনিকের মতো উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের গতি এত বেশি যে প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে সেগুলো প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেই নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নকশা তৈরি হবে বলে জানিয়েছে প্রকল্পে যুক্ত কোম্পানিগুলো।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো “হিট-টু-কিল” প্রযুক্তি। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে বিস্ফোরক ওয়ারহেডের ওপর নির্ভর না করে ইন্টারসেপ্টরটি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রচণ্ড গতিতে আঘাত করবে। এতে মহাকাশেই শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা সম্ভব হবে এবং নিচে জনবসতিতে ধ্বংসাবশেষ পড়ার ঝুঁকিও কমবে।

ইউরোপে এর আগে ইউরোপিয়ান স্কাই শিল্ড ইনিশিয়েটিভ (ইএসএসআই) নামে একটি উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। জার্মানির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে দুই ডজনের বেশি দেশ যুক্ত হয়েছে। সেখানে প্যাট্রিয়ট, আইরিস-টি এবং ইসরায়েলের অ্যারো-৩ ব্যবস্থার সমন্বয়ে বহুস্তরবিশিষ্ট প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ব্লিকসেম এক্সো প্রকল্পের লক্ষ্য ভিন্ন। এটি ইউরোপের নিজস্ব প্রযুক্তিতে এমন একটি উচ্চস্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সামরিক প্রকল্প নয়; ইউরোপের কৌশলগত স্বাধীনতারও প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপীয় নিরাপত্তার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় ইউরোপ এখন নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার বিকল্প তৈরির চেষ্টাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অবশ্য এই প্রকল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো আগামী তিন মাসের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কনসোর্টিয়াম গঠন করতে চায়। আগস্ট থেকে যৌথ প্রকৌশল কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ২০২৭ সালে মহাকাশে প্রথম পরীক্ষামূলক ইন্টারসেপ্টর উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থায়ন বা ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা ড্রোনের নয়; ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরক্ষা গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপের নতুন এই উদ্যোগ সফল হলে তা শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ফলই হবে না, বরং আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকও নির্ধারণ করতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স ও দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমস